রোববার, ২৬ জুন ২০২২, ১২ আষাঢ় ১৪২৯
সিলেটে বন্যা

১০ লাখ মানুষ পানিবন্দী, তিনশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ

সিলেটে টানা বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যায় ১০ লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। বন্যায় জেলার প্রায় তিনশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তলিয়ে গেছে। এসব প্রতিষ্ঠানে পাঠদান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। গত ১৫ মে থেকে টানা ৮-১০ দিনের প্লাবনের রেশ কাটার আগে এবারের বন্যায় সাধারণ মানুষের দিশেহারা অবস্থা। এদিকে সুরমা-কুশিয়ারাসহ সবকটি নদ-নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে।

এদিকে সিলেট নগরীতে বাসাবাড়ির পানিবৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় উপদ্রুত এলাকার মানুষজন নির্ঘুম রাত কাটিয়েছেন। নগরীর উপশহর, মেন্দিবাগ, ছড়ারপার, মাছিমপুর, কালিঘাট, শেখঘাট, কাজিরবাজার, তালতলা, জামতলা, মির্জাজাঙ্গাল, তোপখানা, ঝালোপাড়া, আখালিয়া, সুরমা গেইট, তেররতনসহ বিভিন্ন এলাকার বাসাবাড়িতে পানি প্রবেশ করায় বাসিন্দারা আত্মীয়-স্বজনের বাসায় আশ্রয় নিচ্ছেন। খাবার পানীর সংকটের মধ্যে নিরাপত্তার স্বার্থে উপশহরসহ আশপাশের এলাকার বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করা হয়েছে। সিলেটের ছাতক ও সুনামগঞ্জ গ্রিড উপকেন্দ্র পাহাড়ি ঢলে প্লাবিত হওয়ায় দুর্ঘটনা এড়াতেই বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করা হয়েছে।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা গকুল চন্দ্র দেবনাথ জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত ২৩০টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পানি উঠেছে। এসব বিদ্যালয়ে পাঠদান বন্ধ রয়েছে।

জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আবু সাঈদ মো. ওয়াদুদ জানান, পুরো ৬০টির বেশি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কলেজ ও মাদরাসা পানিতে তলিয়ে গেছে। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানে পাঠদান বন্ধ রাখা হয়েছে।

শুক্রবার সকালে সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. মজিবর রহমান জানান, পুরো জেলায় ১০ লাখে অধিক মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। এদের মধ্যে কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট ও সদর উপজেলার কিছু এলাকায় বন্যা কবলিত এলাকায় সেনাবাহিনী উদ্ধার তৎপরতায় নামছে। অন্যান্য উপজেলায় প্রয়োজনে সেনাবাহিনী উদ্ধার তৎপরতা চালাবে।

স্থানীয় প্রশাসন সর্বোচ্চ সতর্ক রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, উপদ্রুত এলাকার মানুষদের নিরাপদ আশ্রয়ে আনার জন্য জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে উপজেলা প্রশাসন কাজ করছে।

এদিকে বিভিন্ন উপজেলায় রাস্তাঘাট তলিয়ে যাওয়ায় উপদ্রুত এলাকার মানুষ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন। বসতঘর তলিয়ে যাওয়ায় অনেকে ঘরবাড়ির ওপরে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন। ফলে রান্নাবান্না করার সুযোগও পাচ্ছেন না। নলকূপ তলিয়ে যাওয়ায় বিশুদ্ধ পানির অভাব তীব্র আকার ধারণ করেছে। সীমান্তবর্তী উপজেলার অনেক গ্রামে বিচ্ছিন্ন বাড়িঘরে অনেকে অভুক্ত অবস্থায় রয়েছেন বলেও জানা গেছে। বন্যায় ঘরবন্দি হয়ে পড়া এসব মানুষকে উদ্ধার করে আশ্রয় কেন্দ্রে নিয়ে আসতে সেনাবাহিনী কাজ শুরু করেছে।

শুক্রবার পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সিলেটের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সুরমা নদী সিলেট (নগরী) পয়েন্টে বিপৎসীমার ১ দশমিক শূণ্য ৬ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এ পয়েন্টে ১২ ঘণ্টার ব্যবধানে দশমিক ৬২ সেন্টিমিটার পানি বাড়ায় নগরীর বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে।

কানাইঘাট পয়েন্টে দশমিক ৬১ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এদিকে কুশিয়ারা নদী ফেঞ্চুগঞ্জ পয়েন্টে বিপৎসীমার দশমিক ৩৮ সেন্টিমিটার এবং সারিঘাটে সারি নদী বিপৎসীমার ২৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে বলে জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। এছাড়াও লোভাছড়া ও ধলাই নদীর পানিও দ্রুত বৃদ্ধি পেতে শুরু করেছে।

পাউবো সিলেটের নির্বাহী প্রকৌশলী আসিফ আহমেদ জানান, পাহাড়ি ঢল ও বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় নদ-নদীর পানি ক্রমশ বাড়ছে। এর ফলে সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে।

সিলেটে আবহাওয়া অফিসের জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ সাঈদ আহমদ চৌধুরী জানান, চলতি সপ্তাহে সিলেটে কম-বেশি বৃষ্টিপাত হবে। এমনকি পুরো জুন মাস জুড়ে বৃষ্টিপাতের সম্ভবনা রয়েছে। এছাড়া উজানে ভারতের অংশে ভারী বৃষ্টিপাত হওয়ায় নদ-নদীর পানি বাড়ছে।