রোববার, ২৬ জুন ২০২২, ১২ আষাঢ় ১৪২৯

বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত, ত্রাণের জন্য হাহাকার

জৈন্তাপুর উপজেলার খাজার মোকাম উচ্চ বিদ্যালয় আশ্রয় কেন্দ্রে ত্রাণ পেতে ভিড়। ছবি: দৈনিক আমাদের বার্তা

জৈন্তাপুর উপজেলার খাজার মোকাম উচ্চ বিদ্যালয় আশ্রয় কেন্দ্রে ত্রাণ পেতে ভিড়। ছবি: দৈনিক আমাদের বার্তা

* মৌলভীবাজারে প্লাবিত নতুন এলাকা
* বগুড়ায় পানিবন্দি ৭৮ হাজার
* সুনামগঞ্জে ত্রাণের জন্য হাহাকার
* এ পর্যন্ত মৃত্যু ৭০

 

কোথাও কোথাও বন্যা পরিস্থিতির সামান্য উন্নতি হলে সামগ্রিকভাবে এখনো তা অপরিবর্তিতই রয়েছে। মৌলভীবাজারে কুশিয়ারা নদীর বাঁধ ভেঙে প্লাবিত হয়েছে নতুন এলাকা। বগুড়ায় পানিবন্দি হয়ে আছেন ৭৮ হাজার মানুষ। বন্যায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৭০-এ উন্নীত হয়েছে। কেবল সিলেটেই মারা গেছেন ৪৮ জন।তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসেবে এই সংখ্যা ১৭ মে থেকে ২২ জুন পর্যন্ত মোট ৪২। ওদিকে যতদিন বন্যা থাকবে ততদিন খাদ্যসহ প্রয়োজনীয় সবকিছুর সরবরাহ করা হবে বলে সরকারিভাবে জানানো হয়েছে। সুনামগঞ্জে ত্রাণ বিতরণ করেছেন সেনাপ্রধান জেনারেল এস এম শফিউদ্দিন আহমেদ।

প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর:

বগুড়ায় পানিবন্দি ৭৮ হাজার

আমাদের বার্তার বগুড়া প্রতিনিধি জানিয়েছেন, বগুড়ায় প্রবল বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে সারিয়াকান্দি, সোনাতলা ও ধুনট উপজেলায় যমুনা এবং বাঙালি নদীতে পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বুধবার যমুনা নদীতে পানি বিপদসীমার ৬৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। পার্শ্ববর্তী বাঙালি নদীতেও পানি বিপদসীমার ওপরে রয়েছে। বন্যার পানি নদীতীরবর্তী এলাকায় ঢুকে পড়ায় ৭৮ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। তারা খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও গবাদিপশুর খাদ্য নিয়ে সংকটে পড়েছেন।
বগুড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মাহবুবর রহমান জানান, যমুনা নদীর পানি সারিয়াকান্দির মথুরাপাড়া পয়েন্টে বুধবার সকালে বিপদসীমার ৬৪ সেন্টিমিটার ও বাঙালিতে পাঁচ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। বিকালের দিকে যমুনায় পানি স্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছে। গত ১৭ জুন পানি বিপদসীমা অতিক্রম করে।

উপবিভাগীয় প্রকৌশলী আবদুর রহমান জানান, কামালপুর ইউনিয়নে প্রায় সাত কিলোমিটার বাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ। এসব এলাকায় বেশি নজরদারি চলছে। এসব উপজেলায় ২১টি নলকূপ বসানো হয়েছে। ৩০ হাজার পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট পৌঁছানো হয়েছে। ইতোমধ্যে ৪৫ মেট্রিক টন জিআর চাল এবং ১০ লাখ টাকার শুকনো খাবার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। দুর্গত এলাকায় ৩২টি মেডিক্যাল ও পাঁচটি ভেটেরিনারি মেডিক্যাল টিম গঠন করা হয়েছে।

সুনামগঞ্জে ত্রাণের জন্য হাহাকার

সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি জানিয়েছেন, সুনামগঞ্জে ত্রাণের জন্য হাহাকার চলছে। নৌযান দেখলেই ত্রাণের আশায় ঝুঁকি নিয়ে ছুটে যাচ্ছেন বানভাসি মানুষ। কেউ সাঁতার কেটে কেউবা গলাসমান পানিতে নেমেও নৌযানের কাছাকাছি চলে যাচ্ছেন। তবে বেশিরভাগই ফিরছেন খালি হাতে। বিশেষ করে বৃদ্ধ ও শিশুরা প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে ফিরছেন ত্রাণ না পাওয়ার বেদনা নিয়ে। সুনামগঞ্জ জেলার বেশিরভাগ এলাকায়ই এ অবস্থা দেখা গেছে।

ত্রাণ বিতরণ : কোস্ট গার্ড কর্মকর্তা লে. সাব্বির আলম বলেন, ‘সুনামগঞ্জে দুর্গম এলাকায় আমরা ত্রাণ বিতরণ করছি। কিন্তু বন্যা আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা আরও বেশি। আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানিয়েছি।’ সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, বন্যাদুর্গত এলাকায় আমরা ত্রাণ পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছি।

ওদিকে বন্যার্তদের যতদিন প্রয়োজন ততদিন সেনাবাহিনী সুনামগঞ্জে থাকবে বলে জানিয়েছেন সেনাপ্রধান জেনারেল এস এম শফিউদ্দিন আহমেদ।

বৃহস্পতিবার দুপুরে সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার সুরমা ইউনিয়নের মঈনপুর গ্রামে বন্যা দুর্গতদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ শেষে তিনি এ কথা জানান।

সিলেট ও সুনামগঞ্জের বন্যার্তদের মাঝে বিতরণের জন্য ৫ হাজার প্যাকেট খাদ্যসামগ্রী পাঠিয়েছেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য ও রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের মেয়র এ.এইচ.এম খায়রুজ্জামান লিটন। রাসিক মেয়রের নির্দেশে বুধবার সন্ধ্যায় নগর ভবন থেকে সিটি কর্পোরেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ২টি ট্রাক খাদ্যসামগ্রী নিয়ে সিলেট ও সুনামগঞ্জের উদ্দেশে রওনা দিয়েছেন। খাদ্য সামগ্রীর প্রতিটি প্যাকেটে রয়েছে ২ কেজি চিড়া, ১ কেজি চিনি, ৫০০ গ্রাম মুড়ি, ১ প্যাকেট বিস্কুট, এক বক্স (২০ প্যাকেট) খাবার স্যালাইন, ২৫০ গ্রাম খাগরাই, নাপা ওষুধ, মোমবাতি ও দিয়াশলাই ইত্যাদি।

মৌলভীবাজারে কুশিয়ারার বাঁধ ভেঙে নতুন এলাকা প্লাবিত

মৌলভীবাজার প্রতিনিধি জানিয়েছেন, মৌলভীবাজার সদর উপজেলার খলিপুর ইউনিয়নের হামরকোনা এলাকায় কুশিয়ারা নদীর একটি বাঁধের অংশ ভেঙে উপজেলার বিস্তীর্ণ বহু নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। আশঙ্কা রয়েছে পার্শ্ববর্তী হবিগঞ্জ জেলার নবীগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন এলাকাও প্লাবিত হওয়ার।

বুধবার বিকাল ৩টার দিকে বাঁধের ভাঙন দেখা যায়। এতে ঐ এলাকার বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। এদিকে পানিবন্দী বহু পরিবার শেরপুর আজাদ বখত উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ, শামসুন্নাহার বিদ্যাপীঠসহ বিভিন্ন আশ্রয় কেন্দ্রে নিরাপদে অবস্থান করছেন।

ত্রাণ বিতরণ : বুধবার মৌলভীবাজার সদর ও রাজনগর উপজেলার বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে পানিবন্দি প্রায় দুই হাজার মানুষের মাঝে খাবার বিতরণ করেছে মৌলভীবাজার জেলা আওয়ামী লীগ।

জৈন্তায় বন্যা পরিস্থিতির খানিকটা উন্নতি

জৈন্তা প্রতিনিধির পাঠানো খবরে জানা গেছে, উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতি খানিকটা উন্নতি হয়েছে। ৬টি ইউনিয়নের মধ্যে চারিকাটা, জৈন্তাপুর, দরবস্ত, ফতেপুর ও চিকনাগুল ইউনিয়নের নীচু এলাকার অনেক বাড়িঘরে এখনও পানি রয়েছে।

নদ-নদীর পানি কমতে শুরু করেছে। তবে মানুষের কষ্টের শেষ নেই। উপজেলার বিভিন্ন আশ্রয় কেন্দ্রে এখনও কয়েক হাজার মানুষ অবস্থান করছে।

বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন ও ব্যক্তিগত উদ্যোগে শুকনো খাবারের পাশাপাশি আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে রান্না করা খাবার বিতরণ করছে।

ওদিকে বন্যা থাকা পর্যন্ত খাদ্যসহ প্রয়োজনীয় সবকিছু সরবরাহ করা হবে বলে জানিয়েছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়কমন্ত্রী মো. শাহাব উদ্দিন। আজ বৃহস্পতিবার মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার বন্যাকবলিত ১৫শ’ পরিবারের মাঝে ত্রাণসামগ্রী বিতরণের সময় তিনি একথা বলেন। মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।

ওদিকে আজ বৃহস্পতিবার বিএনপি সহাসচিব জৈন্তায় বন্যাদুর্গতদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ করেন।

বন্যায় মৃতের সংখ্যা ৭০, সিলেটে ৪৮

প্রতিনিধিদের পাঠানো খবরে জানা গেছে, সারাদেশে বন্যায় মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে ৭০ জনে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় মারা গেছেন ২৮ জন। সবচেয়ে বেশি ৪৮ জনের মৃত্যু হয়েছে সিলেট বিভাগেই।

জেলাভিত্তিক মৃত্যুর সংখ্যায় শীর্ষে রয়েছে সুনামগঞ্জ। ১৭ মে থেকে ২৩ জুনের মধ্যে এখানে ২৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। সিলেট জেলায় মৃত্যু হয়েছে ১৬ জনের। ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা ও জামালপুর জেলায় মৃত্যু হয়েছে পাঁচজন করে। কুড়িগ্রাম ও শেরপুরে তিনজন করে এবং লালমনিরহাটে একজন মারা গেছেন।

এদিকে বিভাগভিত্তিক মৃত্যুর সংখ্যায় সিলেটের পরই রয়েছে ময়মনসিংহ। এই বিভাগে ১৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। এরপর রংপুর বিভাগে মারা গেছেন চারজন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানায়, বন্যাজনিত বিভিন্ন রোগে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে চার হাজার ৪৮ জনে দাঁড়িয়েছে।