মঙ্গলবার, ২৪ মে ২০২২, ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯

‘তোমারে লেগেছে এত যে ভাল...’

বুদ্ধি হওয়ার পর থেকে শুনে আসা আমার সবচেয়ে প্রিয় বাংলা গানটি হলো ‘তোমারে লেগেছে এত যে ভাল চাঁদ বুঝি তা জানে...’
গানটি গেয়েছেন শিল্পী তালাত মাহমুদ আর অমর এ গানের গীতিকার কে জি মোস্তফা। রোববার (৮ মে)রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তিনি মারা যান। তিনি দীর্ঘদিন ধরে কিডনি ও হৃদযন্ত্রের সমস্যায় ভুগছিলেন।

গত দুই বছর ধরে আমাদের সাহিত্য, সংস্কৃতি আর সঙ্গীতাকাশের নক্ষত্রগুলো একে এক ঝরে পড়ছে। প্রায় প্রতিদিনই এক একটা মৃত্যুর খবর আসে, আর আমরা কেবল মুষড়ে পড়ি। কিছুই করার থাকে না। কারণ মৃত্যু এক অমোঘ পরিণতি। এই পরিণতি এড়ানোর সাধ্য মানুষের নেই। আমরা কেবল নক্ষত্র পতনের শব্দ শুনে যাই।

গীতিকার কবি কলামিস্ট কে জি মোস্তফাকে স্বচক্ষে দেখিনি কোনোদিন। ঢাকায় আসার পর একবার টেলিফোনে কথা বলেছি। সেটা ছিল একতরফা আলাপ। কে জি আমাকে চিনতেন না। চেনার কথাও নয়। কারণ তার চেনার পর্যায়ে যাওয়ার মতো সক্ষমতা আমার নেই। একটু লেখালেখি করি, গড়পরতা বৈষয়িক পরিচিতির বাইরে এই আমার যৎসামান্য ভিন্ন পরিচয়। কে জি মোস্তফারও এরকম একটা বৈষয়িক পরিচয় ছিল। হয়তো তা আমার মতোই অনুল্লেখ্য পরিচয়। কিন্তু যে পরিচয়ে মানুষ অনন্য হয়ে ওঠে, সে পরিচয়ে কে জি মোস্তফা বাংলা সংস্কৃতির আকাশে আলাদা একটা বলয় সৃষ্টি করে নিয়েছেন। সে পরিচয়ে তার কাছে যেতে হলে আমাকে যে যোগ্যতা অর্জন করতে হতো, তার ধারে কাছেও যেতে পারিনি।

তবু কে জি মোস্তফা আমার পরিচিত ছিলেন। সে পরিচয় ছিল তিনভাবে। গীতিকার হিসেবে তার যে অনন্য পরিচয়, সেটা কেবল আমার কাছে নয়, সঙ্গীতপাগল সব বাঙালির কাছেই। ছোটবেলায় রেডিওতে অসংখ্যবার শুনেছি তার গান। তোমারে লেগেছে এত যে ভাল চাঁদ বুঝি তা জানে (ছায়াছবি রাজধানীর বুকে-তালাত মাহমুদ), আয়নাতে ওই মুখ দেখবে যখন (নাচের পুতুল-মাহমুদুন্নবী) গানদুটোই তাকে জনপ্রিয়তার তুঙ্গে তুলেছে। বিশেষ করে এহতেশাম পরিচালিত ‘রাজধানীর বুকে’ ছায়াছবিতে নায়ক রহমানের ঠোঁটমেলানো সে গানটা কিংবদন্তির পর্যায়ে চলে গেছে। সুরে বেসুরে সে গানটি হয়তো আমাদের বাবারাও গেয়েছেন, আমরাও গাই মাঝে মধ্যে, বর্তমানের ব্যান্ডসঙ্গীতে অভ্যস্ত আমাদের ছেলেমেয়েরাও যে আনমনে গায় না, তা কী করে বলি?

দ্বিতীয় পরিচয়টা বলি। ১৯৯০ এর দশকের প্রথম দিককার কথা। সবে লেখালেখি শুরু করেছি। চট্টগ্রামে বিভিন্ন দৈনিকে আর লিটল ম্যাগে টুকটাক লেখা প্রকাশ পাচ্ছে। ঢাকায়ও লেখা পাঠাচ্ছি, তবে খুব একটা পাত্তা পাচ্ছি না কোথাও। এক একটা লেখা পাঠিয়ে দিনের পর দিন অপেক্ষা করি। কোথাও ছাপা হয় না্। সেটা খুব কষ্টের সময়। সব লেখককেই সে কষ্টের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। লেখকের প্রস্তুতিকালের সে কষ্ট আর মনোবেদনার খবর পাঠক কখনো জানতে পান না। কিংবা কেউ কেউ পেলেও সেটা মন দিয়ে উপলব্ধি করা তার পক্ষে কখনো সম্ভব হয় না।

এরকম বিপর্যস্ত মানসিক অবস্থায় চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তর-এর মাসিক পত্রিকা সচিত্র বাংলাদেশ-এ কী বুঝে একটা কবিতা পাঠিয়ে দিলাম। এর আগে অবশ্য চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তর-এর ছোটদের মাসিক পত্রিকা নবারুণ-এ দু’একটি লেখা ছাপা হয়েছিল। সম্ভবত সে সাহসে ভর করেই। মাসখানেক পরে অবাক হয়ে দেখলাম, আমার পাঠানো কবিতাটা ছাপা হয়েছে। কবিতাটার নাম যতদূর মনে পড়ছে ‘চন্দ্রাবতী’। প্রিন্টার্স লাইনে দেখলাম সম্পাদক হিসেবে কে জি মোস্তফার নাম। তখন অবশ্য বুঝিনি তিনি ‘তোমারে লেগেছে এত যে ভাল’র স্বনামধন্য সে গীতিকার। এরকম কনফিউশনের অবশ্য কারণও ছিল। কারণ চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত দৈনিক পূর্বকোণ পত্রিকার সম্পাক ছিলেন আরেক কে জি মুস্তফা। সে কে জি মুস্তফা ঢাকাতেও বড় সাংবাদিক ছিলেন। এছাড়াও তিনি ছিলেন বঙ্গবন্ধুর সময়ে লেবানন ও ইরাক বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত। নামের বানান ছাড়া দুটি নামই এক। আমি ভাবতাম, ইনি সেই কে জি মুস্তফা। কারণ দু’জনের নামের বানানের পার্থক্য তখনো স্পষ্ট হয়ে ওঠেনি আমার কাছে।

সচিত্র বাংলাদেশ পত্রিকায় এরপর থেকে কবিতা প্রকাশ হতে থাকল আমার। এর মধ্যে অবশ্য জেনে গেছি এই কে জি মোস্তফা গীতিকার ও কবি কে জি মোস্তফাই।

১৯৯০ সালের সচিত্র বাংলাদেশের ঈদসংখ্যায় ‘‘অলক্ষ্য যোজক’ নামে আমার একটা কবিতা ছাপা হলো। কবিতাটা সম্ভবত ভালই হয়েছিল। তাই ঈদসংখ্যাতেই সেটা স্থান পেয়েছিল। আমি খুশিতে উড়ছি। কিন্তু মাসখানেক পরে একটা চিঠি এল আমার নামে। চিঠির লেখক কে জি মোস্তফা। চিঠিটা এখানে তুলে দিচ্ছি :

ঢাকা
১৯.৫.৯০
প্রিয় মাসুদ

জনৈক পাঠক আজ একটা অভিযোগ পাঠিয়েছেন, সচিত্র বাংলাদেশ ঈদসংখ্যায় প্রকাশিত আপনার কবিতা ‘অলক্ষ্য যোজক’ পুরোপুরি নকল। এটা নাকি ভারতের প্রশান্ত রায় সম্পাদিত কবিতা-৮৫ তে ছাপানো মনোজ মুখোপাধ্যায়ের কবিতা। এ ব্যাপারে আপনার স্পষ্ট মতামত চাই এক সপ্তাহের মধ্যে। অন্যথায় অভিযোগ পত্রটি সচিত্র বাংলাদেশে ছাপা হবে একতরফাভাবে। আশা করি, যথাসময়ে আপনার জবাব পাবো।

শুভেচ্ছান্তে—
কে জি মোস্তফা
১৯/৫

সচিত্র বাংলাদেশ পত্রিকার সম্পাদকের চিঠি পেয়ে আমি ঠিক এক সপ্তাহের মধ্যেই তার জবাব দিই। স্পষ্ট জানিয়ে দিই, ওই কবিতা আমারই লেখা। কারো কবিতার হুবহু কিংবা আংশিক নকলও নয়। নকলবাজি এবং নকলবাজ দুটোকেই আমি ঘৃণা করি।
এর সাথে এটাও লিখেছিলাম, অভিযোগকারী যেহেতু চট্টগ্রামের লোক, সেহেতু তিনি তার দাবি আমার সামনেই করুক এবং ফয়সালাকারী হিসেবে থাকবেন চট্টগ্রামের দুটি জনপ্রিয় দৈনিকের (আজাদী ও পূর্বকোণ) সাহিত্যপাতার সম্পাদকরা। অভিযোগকারী সুনীল সরকার তাদের সামনেই আমার বিরুদ্ধে তার অভিযোগের প্রমাণ দাখিল করবেন।

বলাবাহুল্য, ওই সুনীল সরকারের পাত্তা আর পাওয়া যায়নি। সচিত্র বাংলাদেশে ফের আমার কবিতা ছাপা হতে থাকে। আর ওই সুনীল সরকারের ছদ্মনামে আসল লোকটা কে, তাও আমি টের পেয়ে গেছি। তবে তা নিয়ে কোনো কথা বলিনি। রুচিতে বেধেছে।
২০০৬ সালে আমি ঢাকায় চলে আসি। চাকরি আমার দেশ পত্রিকায়। সে সময় জানতে পারলাম, আমার প্রিয় সম্পাদক কে জি মোস্তফা তখন আর সচিত্র বাংলাদেশে নেই। অবসর কাল কাটাচ্ছেন। ইচ্ছে হলো, তার সঙ্গে দেখা করি। ফোন নম্বর সংগ্রহ করে একদিন ফোন দিলাম। নিজের কথা বললাম। সচিত্র বাংলাদেশে নকল কবিতাসম্পর্কিত ঘটনাটাও বললাম। কে জি মোস্তফা বললেন, আসুন, একদিন প্রেস ক্লাবে। পরিচিত হওয়া যাবে। যাব বলেছিলাম। কিন্তু যাওয়া হয়নি শেষ পর্যন্ত।

এর পর দীর্ঘদিন তার সাথে কথা বলা হয়নি। ঢাকায় থাকতে থাকতে আমার এক বন্ধুর ভাষ্যমতে, ঢাকাইয়া হয়ে গেছি। জীবন যাপনের তাড়নায় অষ্টপ্রহর ঘূর্ণাবর্তে পড়া খড়কুটোর মতো উড়ছি। চাইলেও এদিক ওদিক যাওয়ার সময় কোথায়?
কে জি মোস্তফার সাথে তৃতীয় পরিচয়টার কথা এখন বলি। এই কে জি মোস্তফা এক অশীতিপর বৃদ্ধ। ঘরে শুয়ে বসে রোগবালাইয়ে ভরা অবসর জীবন কাটাচ্ছেন।

শিক্ষাবিষয়ক দৈনিক ‘আমাদের বার্তা’ পত্রিকায় কাজ করি। খবরের পাশাপাশি এর উপসম্পাদকীয় পাতাটিও দেখতে হয়। একদিন সম্পাদক একটা আর্টিকেল দিয়ে বললেন, এটা যাবে আগামীকাল। আর্টিকেলটার লেখক দেখি কে জি মোস্তফা। খুব আগ্রহসহকারে পড়লাম লেখাটা। না, রাজনৈতিক বা সামাজিক কোনো আর্টিকেল নয়। স্মৃতিচারণমূলক লেখা। ষাট-সত্তর দশকের ঢাকা, মানুষজন, ঘটনাপ্রবাহ এসব নিয়ে, স্মৃতিচারণ, নির্মোহ বিশ্লেষণ। অসম্ভব সুখপাঠ্য সব লেখা। বিশ্ববিদ্যালয় জীবন, সাংবাদিকতা, সাহিত্যকর্ম, সংস্কৃতিপ্রেম, গান লেখা, শিল্পী, সিনেমাপরিচালক, অভিনেতা-অভিনেত্রীদের সঙ্গে পরিচয় এবং ইন্টারেকশন...এবং এছাড়া নিজের জীবনদর্শন। প্রকৃতিপ্রেম, ধর্মবোধ, সামাজিকতা সব কিছু মিলিয়ে অন্যরকম এক বোধের পরিবেশনা।

মুগ্ধ হয়ে পড়তাম তার লেখাগুলো। সামান্য এডিটের পর ছাপা হতো পোস্ট এডিটরিয়াল হিসেবে। সম্পাদক নিজেও দারুণ ভক্ত তার লেখার। আর আমার কাছে তার নামটাকে মনে হতো একটা প্রতিষ্ঠানের মতো।

কে জি মোস্তফার কবি সাংবাদিক পরিচিতিকে ছাপিয়ে গেছে গীতিকার পরিচিতি। গানটি সৃষ্টি হওয়ার পর তিন প্রজন্মের কাছে রোমান্টিক গানের মর্যাদা পেয়ে গেছে। এর আবেদন থেকে যাবে আরো অনেক দিন। আর নিজের সৃষ্টির এমন প্রজন্মপরম্পরা জনপ্রিয়তা আর কোনো গীতিকার নিজের জীবদ্দশায় দেখে গেছেন বলেও মনে হয় না।

না ফেরার দেশে ভাল থাকুন প্রিয় মানুষ, কবি-সাংবাদিক-গীতিকার কে জি মোস্তফা।

লেখক : মাসুদ আনোয়ার, সাংবাদিক ও লেখক ।