মঙ্গলবার, ২৪ মে ২০২২, ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯

সড়কে মৃত্যুর দায় কার

ঈদের ছুটিতে গ্রামে গিয়েছিলাম। ঈদের দুদিন পর ঢাকায় ফেরার পথে ধামরাই এলাকায় এক ভয়াবহ দুর্ঘটনা প্রত্যক্ষ করলাম। স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম সেটা দেখে। মনটা খুবই ভারাক্রান্ত ছিল। ঠিক এমন মুহূর্তে বিনা মেঘে বজ্রপাতের মত আরেকটি খবর মোবাইল ফোনে এল। জানতে পারলাম নাটোরে বাস দুর্ঘটনায় আমার নিকটাত্মীয় (আমার স্ত্রীর আপন ফুপাতো ভাই) মারা গেছেন। তিনি একজন বিসিএস কর্মকর্তা। খবরটি শুনে স্থির থাকতে পারলাম না। কিছুদিন আগে আমার চাচা সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন। এত শোক কীভাবে সহ্য করা যায়? সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে প্রচুর আলাপ-আলোচনা হচ্ছে। কিন্তু ফলাফল শূন্য। বছরের ৩৬৫ দিনের এমন দিন খুঁজে পাওয়া কঠিন, যেদিন সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটে না। সড়কে মৃত্যুর মিছিল যেন একটি স্বাভাবিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোনোভাবেই যেন লাগাম টানা যাচ্ছে না। প্রতিবারের মত এবছরও ঈদে সড়কে ঝরে গেল ৭৫টি তাজা প্রাণ। ঈদের পরের দিনই নিহত হয়েছে ২০ জন। তবে এ বছর বেশি দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে বাইক চালক ও আরোহীরা। ঈদের ছুটিতে ৩১ জন বাইক চালক ও আরোহী প্রাণ হারিয়েছে। সড়কে দুর্ঘটনার কারণটা যখন সবারই জানা তখন কেন সেটা সমাধান হয় না এটাই বড় প্রশ্ন। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে বেশ কিছু পদক্ষেপও নেয়া হয়েছে। কিন্তু তাতে তেমন কোনো পরিবর্তন আসেনি। গলদ তাহলে কোথায়? এভাবেই কি চলতে থাকবে?

সড়কে যে শুধু মানুষের প্রাণহানি ঘটে তাই নয়, অনেক পশু-পাখিরও প্রাণহানি ঘটে থাকে। পশু-পাখি অবুঝ বলে তাদের ওপর দায় চাপানো খুব সহজ। কিন্তু সড়কে মানুষ হত্যার দায় কে নেবে? সড়কে যাদের প্রাণহানি ঘটে তাদের বেশির ভাগই শিশু, তরুণ এবং কর্মক্ষম ব্যক্তি। বয়স্করা তেমন যাতায়াত করেন না বলে তাদের মৃত্যার হার কম। সড়কে একজন মানুষের মৃত্যু তার পরিবারের জন্য কত বড় বিপদ ডেকে আনে, তা নতুন করে বলার কিছু নেই। রাষ্ট্রকেও সড়ক দুর্ঘটনার ক্ষতি বহন করতে হয়। সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে আন্দোলন সংগ্রাম কম হয়নি। সবচেয়ে বড় আন্দোলন হয়েছিল ২০১৮ খ্রিষ্টাব্দে যখন রমিজউদ্দীন কলেজের দুই শিক্ষার্থী সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছিল, সেই সময় বেশ কিছু উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল কিন্তু সেটাতে তেমন কোনো সুফল আসেনি। আসলে ক্ষতটা অনেক গভীরে। সড়ক ও পরিবহন অব্যবস্থাপনা এমন পর্যায়ে চলে গেছে, যে রাতারাতি সেটাকে দূর করা কারও সাধ্য নেই। সড়কে শৃংঙ্খলা কোনো পর্যায়ে আছে তা যারা নিয়মিত সড়কে চলাচল করেন তারা জানেন। যাহোক চালকদের কত শতাংশ প্রকৃত এবং দক্ষ চালক সেটার কোনো সঠিক পরিসংখ্যান নেই। যত সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে, সেটার বিশ্লেষণে দেখা গেছে প্রায় ৬০ শতাংশ চালক থাকে অনভিজ্ঞ, অদক্ষ, সনদবিহীন। বাসের হেলপার দিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা্ মহা সড়কে গাড়ি চালানো হয়। কে রনবে এর দায়ভার? একটি প্রাণ চলে যাওয়ার পর যতই শোরগোল হোক, তাতে আর কী আসে যায়। আমাদের দেশে সড়কে মনিটরিং ব্যবস্থা যে খুবই দুর্বল, তা আর নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। সড়কে যদি সত্যিকারে শৃঙ্খলা থাকে, তাহলে দুর্ঘটনা বহুগুণে কমানো সম্ভব। আমাদের দেশের সড়কগুলোতে মিশ্রজাতের এবং ভিন্ন ভিন্ন গতির গাড়ি চলাচল করে। সেগুলোর মধ্যে বাস, ট্রাক, টেম্ফু, প্রাইভেট কার, মাইক্রো বাস, মোটর সাইকেল, বাই সাইকেল, রিকসা, ভ্যান, লেগুনা, ভটভটি, নসিমন, করিমন, ইজি বাইকসহ নানা জাতের পরিবহন। বলতে গেলে রাস্তার মধ্যে একটি জগাখিচুরি অবস্থা এবং সবাই একটি অসম প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। নিয়মের তোয়াক্কা করা যেন কারও দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না। কে কার আগে যাবে তা নিয়ে চলে মরণ পাল্লা। আর এই মরণ পাল্লার নির্মম শিকার সাধারণ মানুষ। কিন্তু সড়কে যে নৈরাজ্য তা কীভাবে সামাল দেয়া যাবে? বাস-ট্রাকের চালকেরা রাস্তায় নিজেদের রাজা মনে করে। অন্যান্য গাড়ি বা পথচারীর প্রতি তাদের খেয়াল করার যেন সময় নেই। সড়কে গাড়িগুলো দীর্ঘ জ্যামে আটকা থাকে এবং এর ফলে চালকেরা খেই হারিয়ে ফেলে এবং অসহিষ্ণু হয়ে ওঠে। একটু সুযোগ পেলেই বেপরোয়া গতিতে ছুটতে থাকে। হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে চালাতে থাকে গাড়ি আর যার পরিণাম কারও জীবন কেড়ে নেয়া। সড়কে একজন চালকের উপরে অনেকগুলো মানুষের জীবন নির্ভর করে। একটি জরিপে দেখা গেছে, সড়ক দুর্ঘটনার ৮০-৯০ শতাংশ ঘটে থাকে অতিরিক্ত গতি এবং চালকের বেপরোয়া মনোভাবের কারণে। একজন চালক হয়তো দ্রুত গতিতে গাড়ি চালিয়ে সময় বাঁচানোর চেষ্টা করে, কিন্তু তার এই অপরিনামদর্শী চিন্তা মূল্যবান জীবন কেড়ে নেয়। দূরপাল্লার বাসগুলো রাস্তায় অনিয়ন্ত্রিতভাবে চলাফেরা করে। এছাড়াও লোকাল বাস যেখানে সেখানে দাঁড়িয়ে যাত্রী তোলে। এর ফলে তীব্র জটের সৃষ্টি হয়। কেউ যেন তা দেখার নেই। নিয়মগুলো যেন নিভৃতে কাঁদে। যাত্রী তোলার জন্য পাল্লাপাল্লি চলে বাসগুলোর মধ্যে। এর ফলে সড়কে নৈরাজ্য তৈরি হয়। সময় নষ্ট হয়। আর এই সময়কে কভার করতে গিয়ে বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালায়। প্রশ্ন হলো, চালকেরা এত সাহস পায় কোথা থেকে? নিয়ম ভাঙার অপরাধে যদি কঠোর ব্যবস্থা তাদের বিরুদ্ধে নেয়া যেত, তবে কখনই এমনটি হতো না। উন্নত দেশের সড়ক গুলোতে গাড়ির চালকেরা শৃঙ্খলা মেনে চলতে বাধ্য হয়। অনিয়ম করার কোনো সুযোগ তাদের নেই। কিন্তু এখানে এক ভিন্ন চিত্র আমরা লক্ষ্য করি। সড়কে নির্বিচারে মানুষ হত্যা করেও চালরা কীভাবে যেন পার পেয়ে যান। বিচারহীনতার সংস্কৃতি সড়কে নৈরাজ্য যেন আরো তীব্রতর করে তুলেছে। সড়ক দুর্ঘটনায় শুধু যে প্রাণহানি ঘটে তাই নয়, অনেকে আহত বা পঙ্গু হয়ে এক বেদনাময় জীবন কাটান। বোঝা হয়ে ওঠেন পরিবারের জন্য। এছাড়ও আর্থিক ক্ষতি হয় প্রচুর। একটি জরিপ মতে, সড়ক দুর্ঘটনায় বছরে ৪০ হাজার কোটি টাকা নষ্ট হয় যা মোট জিডিপির ২-৩ শতাংশ।

কবে আমরা সড়ক চলাচল বিধি সঠিকভাবে মেনে চলব? আসলে এ বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপের কোনো বিকল্প নেই। সড়কে টহল এবং ট্রাফিক পুলিশের সংখ্যা আমাদের দেশে পর্যাপ্ত নয়। টহল এবং ট্রাফিক পুলিশের সংখ্যা দ্বিগুণ করা উচিত। সড়কের শৃঙ্খলা যে ভঙ্গ করবে, তাকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও পর্যাপ্ত জরিমানার আওতায় আনতে হবে। কাউকে ছাড় দেয়ার কোনো সুযোগ যেন না থাকে সে ব্যবস্থা করতে হবে। আমাদের দেশে কোনো দুর্ঘটনা ঘটার পর জানা যায় প্রকৃত চালক নয়, অন্য কেউ গাড়িটি চালাচ্ছিল। কিন্তু দুর্ঘটনা ঘটার আগে এটা জানা যায় না কেন? চেকিং ব্যবস্থায় আমাদের দুর্বলতা আছে। আমাদের দেশের সড়ক পরিবহন আইনের তেমন কোনো দুর্বলতা আছে বলে মনে করি না। কিন্তু সে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে রয়েছে দুর্বলতা এবং অব্যবস্থাপনা।

যেসব দেশে সড়ক দুর্ঘটনা খুব কম ঘটে, সেসকল দেশের ব্যবস্থাপনা আমাদের অনুসরণ করা উচিত। বেশিরভাগ দুর্ঘটনা ঘটে গাড়ি যখন ওভারটেকিং প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়। হুটহাট ওভারটেকিং বন্ধ করার জন্য টহল পুলিশ কার্যকর ভূমিকা নিতে পারে। একমূখী লেনেও ইদানিং তীব্র জ্যামের সৃষ্টি হয়। অথচ সেটা হওয়ার কথা নয়। যে যার খুশিমত রাস্তায় চললে রাস্তার কোনো শৃঙ্খলা থাকে না। ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্য করার প্রবণতা এদেশের চালকদের মধ্যে প্রবল। আবার ফুটপাত বা ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার না করে রাস্তায় এলোপাতাড়ি দৌড়াদৌড়ি করা পথচারীদের একটি মারাত্মক প্রবণতা। রাস্তায় গতি সুনির্দিষ্ট করে দেয়ার পরও চালকরা সেটা অমান্য করে। এগুলো দেখার যেন কেউ নেই। দুর্নীতি আমাদের পরিবহন এবং সড়ক ব্যবস্থাপনাকে আরো দুর্বল করে দিচ্ছে। দুর্নীতির কারণে চালকেরা অনেক সময় অন্যায় করেও পার পেয়ে যায়। সড়কে জীবন নিরাপদ রাখতে হলে দুর্নীতির লাগাম টানতে হবে। যাত্রী কল্যাণ সমিতি ও বুয়েটের একটি জরিপে উঠে এসেছে যে, ২০১৫ থেকে ২০১৮ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত ৩ বছরে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে প্রায় ১৯ হাজার। মৃত্যু হয়েছে ২৫ হাজার মানুষের এবং আহত হয়েছে প্রায় ৬৩ হাজার মানুষ। গড়ে প্রতিদিন মৃত্যু ২০ জনের ওপরে। ২০২০ খ্রিষ্টাব্দেও ৫ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে একটি জরিপে উঠে এসেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, গাড়ির অতিরিক্ত গতির কারণে ৫৩ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটে। সড়ক দুর্ঘটনায় যারা মারা যায় বা আহত হয় তাদের সামান্য কিছু অংশ হয়তো ক্ষতিপূরণ পায়। কিন্তু বাকিরা পায় না। সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিটি যখন প্রাণ হারান, তখন পুরো পরিবার এক মহা বিপদের মুখে পতিত হয়। সড়ক দুর্ঘটনায় পরিবহন শ্রমিকদের মৃত্যুর হারও কম নয়। সড়ক দুর্ঘটনা বলতে গেলে নিয়ন্ত্রনের বাইরে চলে গেছে। আর কত মায়ের বুক খালি হবে? আর কত বুকফাটা আর্তনাদ দেখতে হবে? নিরাপদ সড়কের জন্য আর বসে থাকার সুযোগ নেই। সবাইকে সচেতন হতে হবে। সড়ক ব্যবস্থাপনার সাথে যারা জড়িত, তাদের তাদের অনেক বেশি ভূমিকা রাখা প্রয়োজন। সড়ক দুর্ঘটনাকে নিছক দুর্ঘটনা না ভেবে এটাকে সড়কে হত্যা হিসাবে গণ্য করে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। বিআরটিএ-কে আরো বেশি দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে। ড্রাইভিং সনদ যেন সহজলভ্য না হয় সেদিকে কঠোর নজরদারি রাখতে হবে। মহাসড়কের পাশ দিয়ে অপরিকল্পিত হাটবাজার ও দোকানপাট গড়ে ওঠা বন্ধ করতে হবে। সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোর জন্য যাদের হাতে ক্ষমতা আছে, তাদের আরো বেশি দায়িত্বশীল আচরণের পরিচয় দিতে হবে। রাজধানীতে টহল চেকপোস্ট আরো বাড়াতে হবে। মোট কথা একটি সমন্বিত প্রচেষ্টা ছাড়া সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব নয়। আজ আমাদের সড়কগুলো যেন এক মরণ ফাঁদে পরিণত হয়েছে। এটাকে নিরাপদ করার জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে যা যা উদ্যোগ প্রয়োজন সবই নিতে হবে। পরিবহন শ্রমিকদের কাছে কোনোমতেই সড়ক পথ জিম্মি হতে পারে না। একে অন্যের ওপর দায় চাপানোর সংস্কৃতি আমাদের অনেক পুরনো। কিন্তু সড়কের এই হত্যার দায় তো কাউকে নিতেই হবে। রাষ্ট্রযন্ত্র ইচ্ছা করলেও এ দায় এড়াতে পারে না। কারণ সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোর মূল দায় রাষ্ট্রের। রাষ্ট্রকে নিতে হবে কঠোর থেকে কঠোরতর পদক্ষেপ, যেখানে নমনীয়তার কোনো সুযোগ থাকবে না। জিরো টলারেন্স দেখাতে হবে রাষ্ট্রকে।

লেখক : মাজহার মান্নান, কবি ও কলামিস্ট ।