মঙ্গলবার, ২৪ মে ২০২২, ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯

জায়গামতো তেল দিন

পৃথিবী চলে তেলে। সম্পর্ক জোড়া লাগে তেলে। রেল কিংবা যে কোনো ধরনের গাড়ি চলে তেলে। খাবারের স্বাদ থাকে তেলে। চাকরি ভালো থাকে তেলে। তেল ছাড়া অচল মানুষ। মানুষ সচল রাখার উপায় নাকি তেল। শিশুকে হাসিখুশি রাখার উপায় তেল মাখানো, অতঃপর গোসল। মানুষ তেলের খনি পেলে নিজেকে বড়লোক মনে করে। এখন দেশের সর্বত্র যেন তেলের খনি আবিষ্কার হচ্ছে: আজ পাবনা, কুষ্টিয়া; কাল পাওয়া যাচ্ছে খুলনায়, গাজীপুরে… মজুতদারের হাতে সব তেলের খনি!

'তেল সভ্যতার বাহন'—এটা বলেছিলেন আমার এক স্কুলশিক্ষক। তার মতে, প্রেম, ভালোবাসা, বিয়ে কিংবা ব্যবসা ও চাকরিবাকরি সবকিছু গতিশীল থাকে তেলের কারণে! পৃথিবীর সবচেয়ে তৈলাক্ত বাণী নাকি 'আই লাভ ইউ'! এই শিক্ষক গানও গাইতেন। 'বাবা ভাণ্ডারী, তেল ছাড়া চলে না রেলগাড়ি' গানটা প্রথম তার মুখেই শোনা। এর অনেক বছর পরে বাংলা ছবির একটা গান শুনেছিলাম এমন—'তেল গেলে ফুরাইয়া/বাত্তি যায় নিভিয়া/কী হবে আর কান্দিয়া'! তেল ফুরিয়ে গেলে কিংবা তেলের আকাল পড়লে তবু মানুষ কাঁদে!

বাড়ির পাশের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতাকর্মী রঙিলাকে দেখতাম তেলের কারণে পাগল হয়ে যেতে। তেল না থাকলে একরকম মাতম করতেন রঙিলা। গায়ে তেল মাখতেন বডিবিল্ডাররা। শিশুদের গায়ে তেল মেখে গোসল করানোর রেওয়াজ ছিল। যাই হোক, সামান্য সরিষার তেল ছোট্ট শিশিতে দিলে রঙিলা গান গাইতে গাইতে নদীর পাড়ে যেতেন। এরপর চপচপাচপ শব্দ তুলে সারা গায়ে তেল মেখে ভৈরব নদীতে ঝাঁপ দিতেন। গোসলের সময়েও তার গান থামত না—'ও দরিয়ার পানি/তোর মতলব জানি/ তোরে ছাড়া যৌবনে মোর লাগলো যে আগুন...'

তেলের বাজারে এখন আগুন। ছোটবেলার খাদ্য তালিকার সরিষার তেল এখন ব্যাকফুটে, সয়াবিন এখন হালের ক্রেজ বা ভাইরাল। আগে সরিষার চাষ হতো দেশে, এখনও হয়। আগে তেল কেনার রেওয়াজও ছিল কম। সরিষা তুলে সেটা ঘানিতে ভাঙিয়ে তেল বানিয়ে বাসায় আনাটা ছিল অভ্যাস। আলু ভর্তা ও ডিমভাজির সাথে সরিষার যে ঝাঁঝ তার কোনো তুলনা থাকতে পারে না! বাঙালির ঝাঁঝের সাথে সরিষার তেলের ঝাঁঝ ছিল মিলনাত্মক। ঘানিতে বসা যেত, ঘানির তালে তালে ঘোরা যেত। সেই সরিষার চাষ কমল, ঘানি হয়ে গেল স্মৃতি। বিজ্ঞাপনে এখন ঘানিকে ময়লা আর কম উৎপাদনশীল দেখানো হয়। চাষাবাদের বদলে এলাকার মানুষেরা যেতে থাকল সৌদি আরব, কাতার, ইরাক কিংবা মালয়েশিয়ায়। কমল চাষের জমি। খাদ্য তালিকায় থাকল না সরিষা আগের মতো, সেই জায়গা দখল করে নিল সয়াবিন! এই সয়াবিনের এখন কত গুণ!

সয়াবিনে প্রোটিন থাকে ৪০ ভাগ, কার্বোহাইড্রেড ৩৫ ভাগ আর তেল থাকে শতকরা ২০ ভাগ। সয়াবিনকে প্রচার করা হয় বিকল্প প্রোটিন হিসেবে। প্রাণিজ প্রোটিনের চেয়ে সয়াবিনের প্রোটিনে প্লাজমা কোলেস্টেরলের পরিমাণ ২৩ থেকে ২৫ ভাগ কম থাকে। সয়াবিন শুধু মানুষের খাদ্যই না, সয়াবিন গাছ জনপ্রিয় পশুখাদ্যও! গ্লিসারিন, রং, মুদ্রণের কালি কিংবা বিভিন্ন ধরনের সাবানের বাণিজ্যিক উৎপাদনে সয়াবিনের ব্যবহার চোখে পড়ার মতো!

শুধু সয়াবিন নয়, বাঙালির খাদ্য তালিকায় এখন অলিভ অয়েল, ক্যানোলা ও সূর্যমুখী তেল ছাড়া পামঅয়েলও দেখা যায়। সবকিছুর উপরে উঠে এসেছে সয়াবিন। কারণ কী?

কারণ সয়াবিন সর্ষের মতো উৎপন্ন হয় না। সয়াবিন অনেকটাই আমদানিনির্ভর। দেশে উৎপাদনের চেয়ে বিদেশ থেকে আমদানি অনেকটা চাতুর্যপূর্ণ! আমদানি আর মজুদের সাথে সিন্ডিকেটবাজি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সিন্ডিকেট করলেই লাভ। সিন্ডিকেটে না থাকলে সয়াবিন কেনাতেও ঝামেলা, বেচাতেও! না খেয়ে বাঁচতে পারে না কেউ, তাই সয়াবিন লাগবেই। এই চাহিদার কাছে জিম্মি মানুষ, জিম্মি রাষ্ট্রও! দুই বছর আগেও যে সয়াবিনের দাম প্রতি লিটার ছিল ৮০ টাকা সেটা ২০২২ সালের রমজানে এসে সরকারকে ঘোষণা দিতে হয় ১৬০ টাকা করে বিক্রি করার। যদিও ব্যবসায়ীরা এই দামে বেচেননি, কেউ কেউ চলে যান মজুদে। এরপর সরকার একবার ১৮০ ও পরে ১৯৮ টাকা দরে সয়াবিনের লিটার বিক্রি করার ঘোষণা দেয়। কিন্তু ২২৫ থেকে ২৪০ টাকার কমে সয়াবিন মেলে না। এক লিটার পাওয়া গেলেও পাঁচ লিটারের বোতল পাওয়া দুষ্কর।

তেল আর রেল নিয়ে যখন দেশে তোলপাড় তখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দেখা যায় ব্যবসায়ীদের গুদামে হানা দিতে। সয়াবিন উদ্ধারের পর গ্রেপ্তার ও জরিমানা করার দৃশ্য দেখা যেতে থাকল টেলিভিশনে। বছরের এক আলোচিত চরিত্র হয়ে দাঁড়াল সয়াবিন!

আবারো তেলের আলোচনায় আসা যাক। সারা পৃথিবী চলে পেট্রোল, অকটেন আর ডিজেলে। বাংলাদেশের মানুষ হাহুতাশ করে সয়াবিন তেলে। তেল নিয়ে হয় টক শো কিংবা ঢাউস ঢাউস রিপোর্ট। সাজেশন পাই আমরা—

এক. তেল না খেলে কী হয়?

দুই. ত্যালফ্যাল ছাড়া যে রান্ধে সে এখন নাকি সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়!

তিন. ফিরে চল মাটির টানের অনুসারে ফিরে যাওয়া যায় সরিষার তেলে।

চার. আগে বলা হতো তেল আর জলে মেলে না। গরীব আর ধনীর মিলন ঘটাতে সচেষ্ট বাংলা ছবির ডায়ালগ আছে এমন—'তেল আর জল কখনো মেলে না, চৌধুরী সাহেব'।

নতুন তত্ত্ব এখন এমন—তেল আর জল একসাথে মেশাতে এখন খুব বেশি শক্তির দরকার হয় না! ম্যাচাচুসেটস ইন্সটিটিউট অভ টেকনোলজির গবেষকরা প্রমাণ করেছেন, খুব বেশি শক্তির অপচয় ছাড়াই তেলের সঙ্গে সহজে জলকে মেশানো সম্ভব! সুতরাং তেল আর জলকে মেশান। লাভ হতে পারে!

পৃথিবী চলে তেলে। সম্পর্ক জোড়া লাগে তেলে। রেল কিংবা যেকোনো ধরনের গাড়ি চলে তেলে। খাবারের স্বাদ থাকে তেলে। চাকরি ভালো থাকে তেলে। তেল ছাড়া অচল মানুষ! মানুষ সচল রাখার উপায় নাকি তেল। শিশুকে হাসিখুশি রাখার উপায় তেল মাখানো, অতঃপর গোসল। মানুষ তেলের খনি পেলে নিজেকে বড়লোক মনে করে। এখন দেশের সর্বত্র যেন তেলের খনি আবিষ্কার হচ্ছে: আজ পাবনা, কুষ্টিয়া; কাল পাওয়া যাচ্ছে খুলনায়, গাজীপুরে… মজুতদারের হাতে সব তেলের খনি! এত সব তেলের বিপরীতে সয়াবিন সহজলভ্য হোক। সুলভে যেন কিনতে পারে মানুষ। শেষমেষ ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি এই গল্পটা বলার জন্য। এটা জীবন থেকে নেয়া একটা গল্প।

দুই বন্ধু। পল্টু এবং বল্টু। সবসময় একসাথে চলাফেরা করে, এক হলে থাকে। একসাথে খায়। দুজনে একসাথে প্রেম করতে যেয়ে বাধে বিপত্তি। পল্টু বল্টুকে অপমান করে। বল্টু সিদ্ধান্ত নেয় প্রতিশোধ নেবার। বল্টু বাজার থেকে শিশিভর্তি সরিষার তেল কিনে আনে। অনেক রাতে বল্টু ও তার আরেক বন্ধু যায় পল্টুর রুমে। হলের ওই রুমে তখন সবাই ঘুমুচ্ছে। বল্টুর অনুরোধে ওই বন্ধু পল্টুর গায়ের কাঁথা সরায়। যখনই পল্টুর টাক মাথায় বল্টু তেল মাখাতে যায় তখনই ধড়মড় করে জেগে ওঠে অন্য কেউ। বল্টু ও তার বন্ধু দৌড়ে পালায়।

এরপর হলে মারামারি বেধে যায়। পরে জানা যায় পল্টু সেদিন তার রুমে ঘুমায়নি। পল্টুর বিছানায় ঘুমিয়েছিল তার বড় ভাই!
প্রিয় পাঠক, ঠিক জায়গায় তেল দিতে না পারলে বল্টুর মতো মারামারিতে গড়ায়। অন্নদাশঙ্কর রায় কেন যে লিখেছিলেন—তেলের শিশি ভাঙ্গলো বলে খুকুর পরে রাগ করো/তোমরা যে সব বড়ো খোকা ভারত ভেঙ্গে ভাগ করো!
দয়া করে তেলের সিন্ডিকেট ভেঙে দিন!

লেখক : আহসান কবির, রম্য লেখক, নাট্যকার ও কলামিস্ট।