রোববার, ২৬ জুন ২০২২, ১২ আষাঢ় ১৪২৯

দুর্যোগ মোকাবেলায় বাংলাদেশ

বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম দুর্যোগপ্রবণ দেশ। এ বছর উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও অতিবৃষ্টির কারণে আখাউড়া, ব্রাহ্মণবাড়িয়া এবং সিলেট ও সুনামগঞ্জের বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে । দেশে প্রতি বছর প্রায় ১০ মিলিয়ন নাগরিক এক বা একাধিক প্রাকৃতিক বিপদের মুখে পড়েন। প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় বাংলাদেশ সরকারের একটি ঐতিহ্যবাহী ক্রিয়াশীল পদ্ধতি আছে। ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মসূচি নামে পরিচিত এই কার্যক্রমের সাথে আমরা পরিচিত।

চলতি বছর বন্যা পরিস্থিতির ক্রমাবনতিতে শঙ্কিত উপদ্রুত অঞ্চলের ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ। সরকার বিপদ সনাক্তকরণ এবং প্রশমনসহ দেশব্যাপী বন্যা প্রস্তুতি এবং সমন্বিত তৎপরতাকে উপদ্রুত এলাকায় তৎপরতা চালানোর দিকনির্দেশনা দিতে ব্যস্ত। সরকারের পদক্ষেপ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মসূচি চলতি বছর বড়সড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। সমস্যার ব্যাপকতাই এর কারণ।

দেশের উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলে ১০ জেলার ৬৪টি উপজেলা বন্যা কবলিত বলে জানিয়েছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী এনামুর রহমান। তিনি বলেন, বন্যা কবলিত এলাকার মধ্যে সিলেট ও সুনামগঞ্জে ভয়াবহ অবস্থা বিরাজ করছে। বলা হচ্ছে, ১২২ বছরের ইতিহাসে সিলেট ও সুনামগঞ্জে এমন বন্যা হয়নি। আগামী দুই দিনে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটবে উল্লেখ করে এনামুর রহমান বলেন, ‘ভারতের বেশ কয়েকটি অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যা হচ্ছে। যে কারণে আমাদের দেশে আগামী দুই দিন বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটার আশঙ্কা করা হচ্ছে। তবে আশার কথা হলো, মঙ্গল ও বুধবার থেকে সিলেট ও সুনামগঞ্জে পানি কমতে শুরু করবে। কিন্তু ওই সময়ে দেশের মধ্যাঞ্চলে বন্যা দেখা দেবে।’ প্রতিমন্ত্রী বলেন, এবারের বন্যায় সিলেটের ৬০ শতাংশ প্লাবিত হয়েছে। আর সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সুনামগঞ্জ। সুনামগঞ্জের ৮০-৯০ শতাংশ এলাকা পানিতে ডুবে গেছে। তিনি বলেন, গত দুই দিনে চার ফুট করে আট ফুট পানি বেড়েছে ওই এলাকায়, যা চিন্তাতীত।(প্রথম আলো) সিলেট ও সুনামগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। পাহাড়ি ঢল আর ভারী বৃষ্টিতে নদনদী ও হাওরের পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় বন্যার আরও বিস্তৃতি ঘটেছে।পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন দুই জেলার প্রায় ৪০ লাখ মানুষ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি সিলেটে স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যা।

সিলেট অঞ্চলে বন্যার পানি নেমে যাওয়ার ক্ষেত্রে কোনও সড়ক বাধা হয়ে থাকলে তা কেটে পানি চলাচল নির্বিঘ্ন করার নির্দেশ দিয়েছেন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম। এ ছাড়া সিলেট এম এ জি ওসমানী হাসপাতালে পানি ঢুকে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হওয়ায় সিটি কর্পোরেশনকে জেনারেটরের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ করার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। স্থানীয় সরকারমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনা অনুযায়ী ইতোমধ্যে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর এবং সিলেট সিটি কর্পোরেশনকে যেসব রাস্তার কারণে পানি নেমে যেতে পারছে না, সেসব রাস্তা তাৎক্ষণিক ভাবে কাটার নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। (সূত্র: প্রথম আলো)

বন্যা কবলিত সিলেট এবং সুনামগঞ্জ জেলার পরিস্থিতি সম্পর্কে বাসস আরও জানায়, জেলার ৯০ হাজার মানুষকে উদ্ধার করে আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে আসা হয়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. মো. এনামুর রহমান জানিয়েছেন শুক্রবার পরিস্থিতি খুবই খারাপ হয়েছে, লাখ-লাখ মানুষ পানিবন্দি পড়েছে। উদ্ধারের জন্য সিভিল প্রশাসন জলযান নিয়ে মাঠে নামে। সিলেট এবং সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক জানান, পানিবন্দি মানুষের তুলনায় জলযান অপ্রতুল। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষরা আরও সাহায্যের আবেদন করছেন। বিষয়টি সরাসরি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে জানান হয়েছে উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী এবং কোস্ট গার্ডকে মোতায়েন করার জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তাৎক্ষণিক ভাবে আর্মড ফোর্সেস ডিভিশনকে নির্দেশ দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী শুক্রবার দুপুরে ৩১টি স্পিডবোডসহ সেনাবাহিনী উদ্ধার কাজে নামে। রাতের দিকে নৌবাহিনী ৩০ জন ডুবরিসহ তাদের নৌযান নিয়ে উদ্ধার কাজ চালায়। শনিবার দুপুরে কোস্টগার্ড পানিবন্দি এলাকাগুলোতে পৌঁছে যায়। সবাই সম্মিলিতভাবে সিলেটের প্রায় ২৫ হাজার মানুষকে সাড়ে চারশ আশ্রয়কেন্দ্রে স্থানান্তর করতে সক্ষম হয়েছেন। প্রতিমন্ত্রী জানান প্রধানমন্ত্রী না ঘুমিয়ে উদ্ধার কার্যক্রম তদারকি করছেন।

তিনি বলেন, সুনামগঞ্জে ২০০টি আশ্রয়কেন্দ্রে ৬৫ হাজার মানুষকে উদ্ধার করা হয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্র গুলোতে রান্না করা খিচুড়ি, মুড়ি, চিড়া, গুড়, পানি এবং পানি বিশুদ্ধিকরণ ট্যাবলেট বিতরণ করা হচ্ছে। এরিমধ্যে বন্যাদুর্গত দুই জেলাতে ৮০ লাখ টাকা করে নগদ বিতরণ করা হয়েছে। রেডিমেড খাবার বিতরণের জন্য এসব টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

টানা ভারী বৃষ্টি ও ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি হয়েছে। ভারত থেকে নেমে আসা পানির তোড়ে উপজেলার হাওড়া নদীর দক্ষিণাংশে বাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। ইতোমধ্যে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আকস্মিক এই বন্যা পরিস্থিতির মোকাবিলায় নানা তৎপরতা গ্রহণ করেছে।(মানবজমিন) বাসস জানায় উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও অতিবৃষ্টির কারণে শুক্রবার রাতে জেলার আখাউড়া উপজেলার হাওড়া নদীর বাঁধ ভেঙে গেছে। এতে আখাউড়ার সীমান্তবর্তী মোগড়া ও দক্ষিণ ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়। অনেক গ্রামীণ রাস্তাঘাট, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্লাবিত হয়েছে।

আখাউড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অংগ্যজাই মারমা জানান, হাওড়া নদীর বাঁধ ভেঙে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দিদের দ্রুত তালিকাভুক্ত করে সহায়তা করা হবে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসক শাহগীর আলম জানান, ১০ থেকে ১২টি গ্রাম পানিতে প্লাবিত হয়েছে। অনেকগুলো পরিবারকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। পাশাপাশি তাদের শুকনা খাবারেরও ব্যবস্থা করা হয়েছে। ত্রাণ ও উদ্ধার কাজের জন্য দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

সিলেটে স্মরণকালের এ ভয়াবহ বন্যায় বিপর্যয়কর অবস্থায় পড়েছে দুর্গত এলাকার মানুষ। সমকাল জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সুনামগঞ্জ ও সিলেটে বন্যাদুর্গত অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের নির্দেশ দিয়েছেন। সেই সঙ্গে তিনি বন্যার্তদের সহায়তা দেওয়ার জন্য বিত্তবানদের প্রতি আহ্বানও জানান। পাশাপাশি সুনামগঞ্জ ও সিলেটে নিজ দলের ৯ এমপিকে নির্বাচনী এলাকায় গিয়ে উদ্ধার তৎপরতা চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর কবির নানক প্রধানমন্ত্রীর উদ্ধৃতি দিয়ে সমকালকে বলেন, সুনামগঞ্জ ও সিলেটের সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বন্যা কবলিত মানুষদের দ্রুত উদ্ধার থেকে শুরু করে তাঁদের মধ্যে শুকনো খাবার পৌঁছে দেওয়াসহ সার্বিক কার্যক্রম নিবিড়ভাবে মনিটর করছেন।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক জানিয়েছেন সারাদেশে বন্যাদুর্গতদের সেবায় ১৪০টি মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে। মেডিকেল টিম উপজেলা ও ইউনিয়নে গিয়ে কাজ করছে। ঢাকায় একটি সমন্বয় কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির সবাই একযোগে কাজ করছেন। স্যালাইন, পানি বিশুদ্ধিকরণ ট্যাবলেটসহ চিকিৎসার জন্য যা যা প্রয়োজন সব নিয়ে যাচ্ছে কাজ করছে এ সব টিম। রাস্তাঘাট তলিয়ে যাওয়ায় নৌকা ও স্পিডবোটের মাধ্যমে তারা মানুষকে সেবা দিচ্ছে।(জিবিনিউজ২৪). সিলেটে বন্যা দুর্গত এলাকায় পানিবন্দি লোকজনকে উদ্ধারে সেনাবাহিনী ও নৌবাহিনী তৎপর রয়েছে। গত শুক্রবার বিকেল থেকে সেনাবাহিনীর ১০ প্লাটুন, ৬টি মেডিকেল টিম,ও শনিবার সকাল থেকে নৌবাহিনীর ৩৫ সদস্য দুটি টিমে ভাগ হয়ে কাজ শুরু করেছে। উদ্ধার কাজে নৌবাহিনী সদস্যরা নিজস্ব যানবাহন ও বিমানবাহিনীর হেলিকপ্টার ব্যবহার করছেন। বিকেলের মধ্যে ৬০ জনের আরেকটি দল আরও যানবাহন ও হেলিকপ্টারসহ উদ্ধার কাজে যুক্ত হবে। সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. মজিবর রহমান সংবাদমাধ্যমকে এ তথ্য নিশ্চিত করেন।

তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ বলেন, সিলেটসহ দেশের কয়েকটি বন্যাপ্লাবিত এলাকায় প্রশাসনের পাশাপাশি আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন এবং তারা ছাড়া অন্য কোনও দলের নেতাকর্মীরা বন্যার্তদের পাশে নেই। মন্ত্রী বলেন, 'ঢাকায় বসে বসে কেউ কেউ টক শোতে বক্তৃতা দিচ্ছেন আর ঢাকায় নয়াপল্টনে কিংবা প্রেসক্লাবের সামনে সরকারের বিরুদ্ধে অনেকে বিষোদগার করছেন, কিন্তু বন্যার্তদের সাহায্য করার জন্য কেউ ঝাঁপিয়ে পড়েননি। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় ঝাঁপিয়ে পড়েছে প্রশাসন ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা।'(সূত্র-বাসস)

অনেক নদ-নদীর দেশ বাংলাদেশ, বিশ্বের বৃহত্তম ব-দ্বীপ এবং বঙ্গোপসাগরে প্রবাহিত বহু শাখা নদীতে অবস্থিত হওয়ার কারণে বন্যার ঝুঁকিপূর্ণ হয়েছে এ দেশ। এ ধরনের অববাহিকার অংশ হওয়ার কারণে এবং গড় সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৫ মিটারের কম উচ্চতায় হওয়ায়, নিকটবর্তী পাহাড় থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল, উজান থেকে আসা জলপ্রবাহ এবং স্থানীয়ভাবে ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে বন্যার ক্রমবর্ধমান হুমকির মুখে পড়ছে বাংলাদেশ । পানি ড্রেনেজ সমস্যা বা পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হয়ে এ সমস্যাকে আরও জটিল করেছে । সব মিলিয়ে বাংলাদেশে প্রায় প্রতি বছরই বন্যার হুমকিতে বা বন্যায় পড়ছে।

চলতি বছরের বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারি, বেসরকারি সংস্থা ও সংগঠনের সমন্বিত ব্যবস্থা নেয়া উচিত। উচিত, দলমত নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধভাবে জাতীয় এ সংকটের মোকাবেলা করা। আমরা প্রত্যাশা করি সরকার, বিরোধীদল, প্রশাসন ও এনজিওগুলো দায়িত্বশীলতার সাথে পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে এগিয়ে আসবে।


লেখক : দেলোয়ার জাহিদ, কানাডা প্রবাসী।