রোববার, ২৬ জুন ২০২২, ১২ আষাঢ় ১৪২৯

আনুষ্ঠানিকতায় মুদ্রানীতি ঘোষণা

দেশ বা জাতির অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের জন্য বর্ষমেয়াদি আয় ও ব্যয়ের সরকারি পরিকল্পনা (বাজেট) বাস্তনায়নে যে আর্থিক নীতি বা ‘ফিস্কাল পলিসি’ নির্ধারণ করা হয়, তার সুষ্ঠু বাস্তবায়নে যাতে সহায়ক ভূমিকা রাখে সে জন্য প্রস্তুতকৃত মুদ্রানীতি বা ‘মনিটরি পলিসি’। সাধারণত বাজেট ঘোষণার পর প্রণীত আর্থিক নীতির লক্ষ্যের সাথে সামঞ্জস্য রেখেই মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হয়। এই নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এখতিয়ারাধীন।

মুদ্রানীতির গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক লক্ষ্য হচ্ছে: মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা, টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখা। উল্লেখিত লক্ষ্যগুলো অর্জিত না হলে আর্থিক খাতে অরাজকতা দেখা দেয়। ফলে বাজেটের উদ্দেশ্যও পুরণ হয় না। মুদ্রাস্ফীতি, সে সাথে মুদ্রা সরবরাহ নিয়ন্ত্রণে প্রায় সারা বছরই নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করে থাকে, যেগুলোর সাথে সকল ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিশেষভাবে পরিচিত। এছাড়াও দেশের অভ্যন্তরে বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ নিয়ন্ত্রণে ও বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার নির্ধারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিনিময় হার বাজারের গতি প্রকৃতির ওপর ছেড়ে দেয়া হবে না কি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখা হবে, এই সিদ্ধান্তটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকই নিয়ে থাকে।

পৃথিবীর সব দেশেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক মুদ্রানীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে মূল ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশেও এর ব্যতিক্রম নেই। মুদ্রানীতির গুরুত্ব সম্পর্কে একটা ধারণা অর্থনৈতিক রিপোর্টার হিসাবে আগে থেকেই ছিলে। এই ধারণা আরো গভীর হয় বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন গভর্নর ড. ফখরুদ্দিন আহমেদের সাথে আলোচনাকালে। ২০০৪ খ্রিষ্টাব্দে তিনি অর্থনৈতিক রিপোর্টারদের সংগঠন ‘ইকনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম’ এর (ইআরএফ) সদস্যদের সাথে এক ‘ওরিয়েন্টেশনে’ মুদ্রানীতি কী, কেন ইত্যাদি বিষয়ে বিষদ আলোচনা করেছিলেন। তখন মনে হয়েছিল এত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পৃথকভাবে সংবাদ মাধ্যমে আশা উচিত, যাতে সংশ্লিষ্ট মহল ছাড়াও সাংবাদিক ও শিক্ষিত সাধারণ শ্রেণিও যেন বিষয়টি সম্পর্কে জ্ঞাত হতে পারেন। এর আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কখনো প্রচারমূলক বা আনুষ্ঠানিকভাবে মুদ্রানীতি ঘোষণা করেনি (মাঝে মাঝে সার্কুলার বা প্রেস রিলিজ ইস্যু করা ছাড়া)।

ইতিমধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসাবে দায়িত্ব নিয়েছেন ড. সালেউদ্দিন আহ্মেদ। একদিন জিয়াউল হাসান সিদ্দিকীর (তখন সম্ভবত তিনি এক্সিকিউটিভ ডাইরেক্টর ছিলেন, পরে ডেপুটি গভর্নর হয়েছিলেন) সাথে এ বিষয়ে আলোচনা কালে মুদ্রানীতি ‘আনুষ্ঠানিক ঘোষণার মাধ্যমে আসা উচিত’ এই মতের সাথে তিনি একমত পোষণ করেন। এ ব্যাপারে তিনি আমাকে উৎসাহিত করেন। নতুন গভর্নরের সাথে কয়েকবার আলোচনার পর তিনি আনুষ্ঠানিক ঘোষণার মাধ্যমে মুদ্রানীতি প্রকাশ করতে রাজি হন। পরবর্তী পদক্ষেপ ইআরএফ থেকে নেয়া হয়। ঠিক করা হয় মুদ্রানীতির ভঙ্গির ওপর অর্থনৈতিক সাংবাদিকের সাথে এক আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে জাতীয় প্রেস ক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে। মূল বক্তব্য দেবেন গর্ভনর নিজে। সাথে তাঁর সহকারী হিসাবে থাকবেন ব্যাংকের একজন এক্সিকিউটিভ ডাইরেক্টর জনাব জামসেদ। এছাড়া অতিথি হিসাবে বক্তব্য রাখবেন ড. মশিউর রহমান (বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক বিষয়ক উপদেষ্টা)। ২০০৫ খ্রিষ্টাব্দের ৮ নভেম্বর এ অনুষ্ঠানটি হয়। অনুষ্ঠানটির টাইটেল ছিল গড়হবঃধৎু ঢ়ড়ষরপু ংঃধহপব ড়ভ ইধহমষধফবংয ইধহশ। পরের দিন সকল দৈনিকে নির্দিষ্ট পৃষ্ঠায় যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে মুদ্রানীতির ওপর অনুষ্ঠানের খবর ছাপা হয়।

এরপর থেকে বর্র্তমান সময় পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতি ছয়মাস অন্তর মুদ্রানীতি, এর অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনের গতি, হাল-অবস্থা, আগামী মুদ্রানীতি সম্প্রসারমূলক না সংকোচন মূলক হবে ইত্যাদি আরো সংশ্লিষ্ট বিষয় অন্তর্ভুক্ত করে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করে আসছে। ফলে সকল মহলই মুদ্রানীতি নিয়ে কৌতুহলী হয়ে ওঠেন, বিশেষ করে বাণিজ্যিক ব্যাংক, বিভিন্ন বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং ক্যাপিটাল মার্কেট সংশ্লিষ্টরা।


লেখক: মনোয়ার হোসেন, সিনিয়র সাংবাদিক ।