বুধবার, ১০ আগস্ট ২০২২, ২৬ শ্রাবণ ১৪২৯

বর্ষাবিধৌত অক্ষর- ১

১. বৃষ্টি ও বর্ষা: স্মৃতি, চিন্তা, পারিপার্শ্বিক

আত্মজীবনী, আত্মকথা, আত্মস্মৃতি ইত্যাদি ‘অবশ্যই’ নিজের কথা, তথাপি ‘শুধুই’ নিজের কথা নয়: প্রকৃতি, পারিপার্শ্বিকতা এবং মানুষের কথাও। যে কালপর্ব আর ঋতুচক্র পেরিয়ে চলে ব্যক্তিসত্ত্বা, সে-সব কথাও এবং যে রূপান্তরের ভেলায় ভেসে চলেছে যাপিত জীবন, তার-ও বিবরণ বটে। ব্যক্তিগত বয়ান থেকে আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক-প্রাকৃতিক বহুমাত্রিকতার এইসব ভাবনার জগৎ, আখ্যানসমূহ আর জলবায়ুর পরিবর্তন কোলাজ-আকারে ভিড় করে বহতা জীবনের বাঁকে বাঁকে।সম্ভবত এভাবেই, ‘স্মৃতি, চিন্তা, পারিপার্শ্বিক’-এর ত্রিভুজে তৈরি হয় জীবনের খসড়া এবং যাপনের সমান্তরালে লিপিবদ্ধ হয় আত্মসমীক্ষা, পালাবদল ও পরিবর্তনের অনুধ্যান।ভারতীয় উপমহাদেশের বিশেষত বাংলার প্রাকৃতিক বাস্তবতায় এসবের নাম দেওয়া যায় ‘বর্ষাবিধৌত অক্ষর’, যাতে প্রকৃতি, বিশ্বপরিস্থিতি ও ব্যক্তিগত পরিসরের পরিবর্তনের নিরীক্ষামূলক আঙিকের খোঁজ পাওয়া যায় জীবনের বহতা নদীর ধারাবাহিকতায়।

জীবন, জগৎ ও প্রকৃতির পরিধিতে লেখালেখির বিষয়ের অভাব বা বৈচিত্র্যের কমতি নেই। চোখের সামনে দিয়ে প্রকৃতি, পরিবেশ, জীবন ও জগতের নানা কিছুকেই আলাদিনের চেরাগের দৈত্য যেন বদলে দিচ্ছে।  কম্পিউটার এলো, ইন্টারনেট এলো, মোবাইল এলো, লোকজন দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে গেলো। দ্রুত ও প্রতিদিন ঘটতে থাকলো ঘটনাগুলো। সারা বিশ্ব চলে এলো হাতের মুঠোয়। ঘটে গেলো প্রাকৃতিক রূপান্তর। জলহীন বর্ষা কিংবা শীতহীন উইন্টারের দেখা পাওয়া সম্ভব হলো বৈশ্বিক উষ্ণায়নের দাপটে। বিলাতের মতো তুষার, বৃষ্টি ও রোদের মিলিত আবহাওয়াও বদলে গিয়ে তাপদগ্ধ অগ্নিকূপে পরিণত হলো।

স্বাভাবিক আর দশটা ঘটনার মতোই এসব ঘটলো। কিন্তু এর ফলে মারাত্মক সব পরিবর্তন হয়ে গেছে ঠিক আমাদের চোখের সামনে দিয়েই। আমরা পরিবর্তনকে নিত্য উপলব্ধি করছি এবং পরিবর্তনের গতিবেগকে আত্মস্থ করতে বাধ্য হচ্ছি একান্ত বাধ্যগত, অনুগত ছাত্রের মতো।    অথচ আমরা টের পেলাম না বিশ্বায়ন ঠিক কখন এসেছিল আমাদের জীবনে। দিন-তারিখ দিয়ে সুনির্দিষ্টভাবে বলা দুষ্কর হলেও আমরা যে বিশ্বায়নের স্রোতেভাসা মানুষ হয়ে রইলাম। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন কখন সবকিছু ছারখার করলো, সেটাও টের পাওয়ার আগেই পুড়তে লাগলো চারপাশ।

ড. মাহফুজ পারভেজ

আমরা নিজেদেরকে বলতে পারি, পুরনো ও নতুন প্রজন্মের মাঝখানের মানুষ। পুরাতন পেরিয়ে নতুনে আসতে হয়েছে আমাদের, সব প্রজন্মকেই তেমন পথে চলতে হয়। সে পরিবর্তন ব্যক্তিগত জীবনে, সামাজিক প্রাঙ্গনে, সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে, পারিপার্শ্বিক আবহে প্রকৃতি ও পরিবেশে স্পষ্টতর দাগ রেখেছে।জন্মের পর দেখেছি, বাড়ির রেডিওতে একটি কি দুটি স্টেশন শোনা যেতো। টেলিভিশনের একটি চ্যানেলের ছিল মাত্র কয়েক ঘণ্টার অনুষ্ঠান। টেলিফোন তুলে নম্বর নয়, লোকের নাম বদলে অপারেটর লাইন দিত। কিশোরগঞ্জ থেকে ঢাকা, চট্টগ্রামে কথা বলতে হলে কল বুক করতে হতো। সে লাইন বা সংযোগ কখনো পাওয়া যেতো কখনো যেতোই না।মৃত্যু বা জরুরি খবর দিতে থানার ওয়ারলেসে জানাতো হতো অন্য কোনো জেলার কোনো থানায়। সেখান থেকে ম্যাসেঞ্জার খবর দিয়ে আসতো নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে।শহরে পত্রিকা আসতো পরের দিন বিকালে। তা-ও তিনটি কি চারটি পত্রিকা। গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত ও বসন্ত আসতো সগৌরবে, নিজস্বতার জানান দিয়ে।

দিনের সারাবেলা আমাদের কাটতো স্কুলে, বাসায়, পাবলিক লাইব্রেরিতে ও খেলার মাঠে। সিনেমা হল থাকলেও তাতে আমাদের প্রবেশ নিষেধ। মাগরিবের আজান হওয়ার আগেই শহরের সব দরজা আমাদের সামনে বন্ধ হয়ে যেতো। বাসায় থাকাই তখন নিয়ম। খুব বেশি দরকার হলে অনুমতি সাপেক্ষে বাড়ির সদর দরজা পর্যন্ত যাওয়া যেতো। এর বেশি মোটেও নয়। নিয়ম ভাঙতো বর্ষায়। বৃষ্টিতে ভিজতে, নদীতে লাফিয়ে পড়তে কেউ বারণ করতো না।

বড় হলে এসব নিয়ম শিথিল হয়েছে, কিছু কিছু বদলেও গেছে। সন্তানদের বৃষ্টিতে ভিজতে দিতে এখনকার অভিভাবকরা নারাজ। তবে, চলাগলের গতি কিংবা আসা-যাওয়ার পরিসর বেড়েছে মানুষের জীবনে। আগেও শহরের পাড়ায়, মহল্লায় নানাজনকে বিদেশে যেতে দেখেছি। স্বাধীনতার পর পর তখন বিদেশে যাওয়া কঠিন ছিল না। তথাপি খুব কমজনই বাইরের দেশে যেতেন। গেলেও স্থায়ীভাবে থেকেছেন কম মানুষই। তিন-চার বছর পর পর বিদেশে থেকে দেশে এসেছেন তারা। সে দেশে গল্প করেছেন। আধুনিক স্টাইলের জামা, জুতা, ঘড়িতে সেজে শহরে বের হয়েছেন। তারপর আবার চলে গেছেন। অনেকেই দশ-বারো বছর বিদেশে থেকে একেবারেই ফিরে এসেছেন।

এখন যারা বিদেশে যাচ্ছেন, তারা ফিরে আসছেন না। মাইগ্রেট করছেন। নতুন দেশের নাগরিকত্ব নিয়ে থেকে যাচ্ছেন। অথচ তাদের দূরের, বিদেশের মানুষ মনে হয় না। এক সাথে মাঠে খেলে ও পড়াশোনা করে বড় হয়েছি, এমন বহুজন এখন প্রবাসে। বিদেশে বসতি স্থাপনকারী বন্ধুদের ইচ্ছা হলেই হাতের মুঠোয় পাওয়া যাচ্ছে। ম্যাসেঞ্জারে, হোয়াটসআপে শুধু বলা বলা নয়, তাদের সচল উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে। বছরে একাধিক বার তারা দেশেও আসছে।

প্রযুক্তির কারণে বিশ্বকে মনে হচ্ছে হাতের নাগালে। তথ্য ও যোগাযোগের বন্যায় ভাসছি আমরা। খবর-বিনোদন ইত্যাদি দেশকালের দূরত্ব ঘুচিয়ে চলে এসেছে হাতের মুঠোফোনে। দূরকে মনে হচ্ছে কাছে। নিমেষেই সবাই সব খোঁজ-খবর পাচ্ছি। পৃথিবী হয়ে গেছে ‘বিশ্বগ্রাম’ বা ‘গ্লোবাল ভিলেজ’। কিন্তু বিশ্বের প্রকৃতি মনে হয় আগের মতো নেই। মানুষ ও প্রকৃতির সহাবস্থানে বিরাট রূপান্তর হয়েছে। সহযোগিতার জায়গায় বৈরিতার দেখা পাওয়া যাচ্ছে প্রকৃতির কাছ থেকে। এজন্য প্রকৃতি নিজে যত না দায়ী, মানুষ তারচেয়ে বেশি অভিযুক্ত।

বলা হচ্ছে, অনাগতকালের মানুষের বসবাসের ধরন আরো বদলাবে। এমন এমন পেশা তারা গ্রহণ করবে, যেগুলো এখনো দেখাই যাচ্ছে না। মানুষের সম্পদ ও অর্থ-বিত্ত থাকবে হাতের কার্ডে বা চিপসে। স্থায়ী বা অস্থায়ী ঠিকানায় মানুষকে স্থায়ী, স্থির ও নিশ্চল দেখতে পাওয়া যাবে না। সে থাকবে কাজের প্রয়োজনে চলিষ্ণু। তাকে ধরা যাবে সাইবার জগতে। ইমেইলে, ইন্টারনেট ফোনে কথা ও দেখা হবে তার সঙ্গে। কিন্তু একই সঙ্গে তার স্থানান্তর ঘটবে নানা দেশে, নানা শহরে, জনপদে।

পৃথিবী যে সেদিকে যাচ্ছে, তা অনুভব করতে অসুবিধা হয় না। কাগজ-কলমের ট্র্যাডিশনাল ব্যবহার কমছে। বলা হচ্ছে, এক সময় ‘জিরো পেপার’ পরিস্থিতি এসে যাবে। ক্লারিক্যাল পোস্টগুলো উঠে যাবে। একজন মানুষ তার ল্যাপটপ বা ডেক্সটপে বসে একা একাই সামলাবে তার ওয়ার্ক স্টেশন বা অফিস। ই-কমার্স, ই-লার্নিং, ই-গভার্নেন্স ইত্যাদির মতো ই-লাইফ চলে আসবে। মানুষের জীবন প্রোগ্রামিং-এর অংশ হয়ে অতিদ্রুত গতিতে চলতে থাকবে। যান্ত্রিক মানুষ প্রকৃতি ও পরিবেশ থেকে হয়ে পড়বে আরও বিচ্ছিন্ন।

এইসব চিত্রকল্প ও ধারণা পৃথিবীর বুকে নানাভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে বা হবে। কিন্তু বাংলাদেশে এসবের ছাপ ও প্রভাব আমরা পাই অনেক পরে। তবে, নতুন প্রজন্ম আরো বেশি প্রযুক্তি-নির্ভর ও প্রযুক্তি-বান্ধব জীবনের দিকে যে দ্রুতবেগে ধেয়ে যাচ্ছে, তা লক্ষ্য করলেই টের পাওয়া যাচ্ছে। সামনের দিনগুলোতে জীবন-যাপন সত্যিকার অর্থেই এক আমূল পরিবর্তনের দিকে চলে যাবে।

এতোসব সম্ভাবনাময় পরিবর্তনের ফলে সব কিছুই ভালো হবে? মন্দ বা নেতিবাচক প্রভাব হবে না? হয়ত পড়বে এবং সেসব ঠেকানোর ব্যবস্থাও করবেন আধুনিক সমাজবিজ্ঞানিরা। এটা ঠিক যে, একটি ছোট্ট কিউবে বসে শুধু অফিস নয়, বিশ্ব-চালানো মানুষগুলো ক্রমশ অত্যন্ত ক্ষুদ্র গণ্ডিতে আবদ্ধ হবে। তার জীবন ও জগৎ ১৪, ২০, ২৪ ইঞ্চি মনিটরের ভেতর দিয়েই সম্পর্ক গড়বে মহাবিশ্বের সঙ্গে। অনেক কিছু্র আস্বাদই মানুষ পাবে ভার্চুয়াল ভাবে। প্রকৃতি-ঘেষাঁ প্রকৃত-জীবন হয়ত চলে যাবে অধরা দূরত্বে।

হয়ত নদীতে, জঙ্গলে, বনে, হাওরে, পাহাড়ে, সৈকতে দাপাদাপি করে প্রকৃতির সঙ্গে মিলেমিশে জীবনকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে না অনাগতকালে। অরুণ আলোর উচ্ছ্বাসে জীবনকে আলোকিত ও নানা রঙে রাঙানোও সম্ভব হবে না। বাস্তবের জমিতে দাঁড়িয়ে জীবনকে পরখ করাও সবার জন্য সম্ভব হবে না। হয়ত সব কিছুই হবে, প্রযুক্তির ভিন্নতর আঙিকে। মানুষের মতো বদলাবে বিশ্বপরিস্থিতি, বিভিন্ন দেশ ও অনুষঙ্গ। গণতন্ত্র, মানবাধিকার, ধর্ম, দর্শন, সাহিত্যবোধ ও প্রথাগত ধারণা। কিছু পরিবর্তন আনন্দের হবে, কিছু বেদনার। সবচেয়ে কষ্টের হবে এটাই যে, হারানো অনেক কিছুই, দিন, ক্ষণ, পরিবেশ, মানুষগুলো আর ফিরে আসবে না। বর্ষার বৃষ্টিতে ভেসে যাওয়া জলের মতো বর্ষাবিধৌত অক্ষরের বুকে রয়ে যাকে তাদের ছলছল স্মৃতি।