বুধবার, ১০ আগস্ট ২০২২, ২৬ শ্রাবণ ১৪২৯

ইউটিউবারের কল্যাণে পরিবারের সন্ধান পেলেন পাচার হওয়া হামিদা বানু

কাজের সন্ধানে ২০ বছর আগে ভারত ছেড়েছিলেন হামিদা বানু। কিন্তু তিনি কি জানতেন, পাচারের শিকার হয়ে তার স্থান হবে পাকিস্তানে! অবশেষে দু’জন ইউটিউবারের কল্যাণে তিনি আবার ফিরে পেয়েছেন নিজের পরিবার। ভার্চ্যুয়ালি পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে একত্রিত হয়েছেন। বর্তমানে হামিদা বানুর বয়স ৫০ উত্তীর্ণ। পরিবারের সদস্যরা পাকিস্তানে ভারতীয় হাইকমিশনকে অনুরোধ করেছে, তারা যেন তাকে দেশে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন এমএসএন।

পূর্ব মুম্বইয়ের কুরলার একজন এবং করাচির একজন- মোট দু’জন ইউটিউবারের কল্যাণে হামিদা বানু তার আত্মার আত্মীয়দের খোঁজ পেয়েছেন। এর মধ্যে কুরলার ইউটিউবার খালফান শেখ হ্যাসট্যাগ মুম্বই নামে একটি চ্যানেল পরিচালনা করেন। তিনি বলেন, রোববার বিকেলে তিনি ভিডিওতে একজন নারীকে দেখতে পান। তাতে ওই নারী বলেন, তিনি কুরলার কুরেশি নগরে বসবাস করতেন। তাকে ২০ বছর আগে পাকিস্তানে পাচার করা হয়েছে।

ফলে আমি ওই ভিডিওটি আমার সাবস্ক্রাইবারদের সঙ্গে শেয়ার করি, যদি কেউ তাকে চেনেন! এর ৩০ মিনিট পরে জানতে পারি, তার পরিবার আছে। তার নাতি বিলালের সঙ্গে কথা বলি। এরপর খালফান শেখ পাকিস্তানের করাচিতে অবস্থানরত ইউটিউবার ওয়ালিউল্লাহ মারুফের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
ওয়ালিউল্লাহ মারুফ প্রথমে ওই ভিডিওটি শেয়ার করেছিলেন। তিনি করাচির মাঙ্গহোপিরের ২৭ বছর বয়সী যুবক। পাচার হয়ে পাকিস্তানে গিয়েছেন এমন প্রায় ৪০ জনকে শনাক্ত করে তাদেরকে নিজের দেশে ফেরত যেতে সহায়তা করেছেন তিনি। বলেন, তার মা-ই প্রথম একজন বাংলাদেশিকে তার দেশে ফেরত পাঠাতে সহায়তা করেছিলেন। সেই থেকে শুরু। তিনি বলেন, এক সপ্তাহ আগে আমার বাসায় আসেন হামিদা বানু। আমাকে তার কাহিনী জানালেন। তাকে নিয়ে ১১ মিনিটের ভিডিও বানালাম। তা পোস্ট করলাম ইউটিউবে। যারা এর দর্শক তাদেরকে অনুরোধ করলাম তারা যেন তাকে তার পরিবারকে খুঁজে পেতে সহায়তা করেন। খালফান শেখের সঙ্গে যোগাযোগ হয়। তিনিও ইউটিউবে চ্যানেল পরিচালনা করেন। জানান, তিনি হামিদা বানুর পরিবারকে খুঁজে পেয়েছেন।

মুম্বইয়ের কুরেশি নগরে বসবাস করেন হামিদা বানুর মেয়ে ইয়াসমিন। তিনি তার মেয়ের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। এ সময় তার ছেলে আমান তার কাজিন বিলালের সঙ্গে ওই ভিডিওটি দেখছিল। সেই প্রথম তাকে ওই ভিডিওর কথা জানায় ইয়াসমিনকে। বলে, তাকে নানীর মতো লাগছে দেখতে। ইয়াসমিন বলেন, মা যখন বিদেশে যান, তখনও জন্ম হয়নি আমানের। তবে সে মার ছবি দেখেছে। শুনেছে তার নানা গল্প। যখন সে আমাকে ওই ভিডিও দেখালো, আমি বিস্মিত হলাম। এ যে আসলেই আমার মা!

ওই রাতেই সাড়ে নয়টার সময় ভিডিওকল আয়োজন করা হলো। তাতেই ভার্চ্যুয়ালি নিজের পরিবারের সঙ্গে যুক্ত হলেন হামিদা বানু। ইয়াসমিন ফিরে পেলেন তার মাকে। হামিদা বানুর ছোট বোন সাঈদা। তিনিও ভিডিওকলে যুক্ত হলেন। বলেন, কলের অন্যপ্রান্তে যখন আমার বোনকে দেখলাম, নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। আমরা সবাই কান্নায় ভেঙে পড়েছিলাম।

হামিদা বানু তার পিতামাতার সঙ্গে কুরেশি নগরে বসবাস করছিলেন। তার বিয়ে হয় মোহাম্মদ হানিফ শেখের সঙ্গে। আছে দুটি ছেলে ও দুটি মেয়ে। স্বামী হানিফ ছিলেন মদে আসক্ত। ফলে সন্তানদের ভরণপোষণের জন্য গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করতেন হামিদা। ১৯৯০ সালে কেউ একজন তাকে উপসাগরীয় অঞ্চলে গিয়ে ভাল আয়ের প্রলোভন দেখায়। এরপর তিনি চলে যান দুবাই, আবুধাবি। সেখানে অবস্থান করেন ৯ বছর। হামিদা বানু বলেন, ২০০২ সালে ভিকরোলিতে একজন নারীর সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়। তিনি আমাকে দুবাইতে আরেকটি কাজ প্রস্তাব করেন। ওই সময় আমার বড় ছেলের বিয়ে নিয়ে ভাবছিলাম। একটি বাড়ি কেনার কথা ভাবছিলাম। তাই তার প্রস্তাব মেনে নিলাম। ওই মহিলা আমার পাসপোর্ট নিয়ে নিলেন। প্রথমে আমাকে দুবাই পাঠালেন। দুবাই অবতরণের পর আমাকে পাকিস্তানগামী একটি ফ্লাইটে উঠিয়ে দেয়া হয়। সেই ফ্লাইটটি চলে যায় সিন্ধু প্রদেশে।

সেখানে তাকে একজন তামিল নারীর সঙ্গে একটি কুঁড়েঘরে আটকে রাখা হয়। যখন তারা দু’জনে বুঝতে পারেন, তাদেরকে পাচার করা হয়েছে, তখন তারা পালান। পালিয়ে হেঁটেই চলে যান করাচিতে। হামিদা বানু বলেন, এ সময় আমরা ফুটপাতের ওপর ঘুমিয়েছি। সঙ্গে থাকা সামান্য অর্থ দিয়ে প্রয়োজনীয় জিনিস কিনেছি। আবার তা বিক্রি করেছি। লাভের অর্থ দিয়ে খাবার কিনেছি। এমন এক সময়ে একজন হকারের সন্ধান পাই, যার স্ত্রী মারা গেছেন। রেখে গেছেন ৪টি ছেলেকে।

২০১০ সালে ওই ব্যক্তিকে বিয়ে করেন হামিদা বানু। কিন্তু কয়েক বছর পরেই তিনি মারা যান। হামিদা বানু বলেন, তার বড়ছেলেই এখন আমাকে দেখাশোনা করছে। কিন্তু কুরলায় আমার বাড়ির কথা মানসপটে ভেসে ওঠে। এমন কোনো দিন নেই, যেদিন আমি কাঁদি না। অবশেষে আমার মেয়ে ও বোনের সঙ্গে কথা বলতে পেরেছি। এখন আর এই পাকিস্তানে আমি বসবাস করতে চাই না। কিন্তু আমার কাছে কোনো ডকুমেন্ট বা পাসপোর্ট নেই। পরিবারের কাছে ফেরত যাওয়ার জন্য ভারতীয় হাইকমিশনের সহায়তা প্রার্থনা করছি।