
সরকারি ও বেসরকারি বৈষম্য দূরীকরণের লক্ষ্যে শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণ আন্দোলনের সূচনা করেন শিক্ষক নেতা প্রফেসর এম শরীফুল ইসলাম। ১৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দের মাঝামাঝি সময়ে যখন তিনি সাংগঠনিক সফরে খুলনা গিয়েছিলেন, তখন এক শিক্ষক সমাবেশে তাঁর সঙ্গে পরিচিত হই আমি। যদিও সঠিক তারিখটি আজ আর মনে নেই।
১৯৭১-পরবর্তী সময়ের যুদ্ধ-বিধ্বস্ত স্বাধীন বাংলাদেশ। সর্বক্ষেত্রে যখন দেশ পুনর্গঠনের কাজ চলছিলো; তখন শিক্ষাব্যবস্থা পুনর্গঠনের লক্ষ্যে সচেতনতা সৃষ্টির জন্য পুরো দেশ চষে বেড়ান শিক্ষা ও শিক্ষকদরদি এই নেতা। সেই সময়েই তাঁর গঠনমূলক ও যুক্তিপূর্ণ হৃদয়স্পর্শী বক্তব্যে অনুপ্রাণিত হয়েছিলাম এবং আমরা শিক্ষক সমাজ নতুনভাবে বাঁচার স্বপ্ন দেখেছিলাম। তাঁর সেদিনের দিক নির্দেশনাকে সামনে রেখেই শিক্ষক সমাজের অধিকার ও মর্যাদা আদায়ের সংগ্রামে সক্রিয় অংশ নিয়েছি এবং দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে সর্বদা সচেষ্ট থেকেছি।
প্রফেসর এম শরীফুল ইসলাম ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নবীনগর উপজেলার চিত্রি গ্রামে ১৯৪২ খ্রিষ্টাব্দের ৩০ এপ্রিল জন্মগ্রহণ করেন। নবীনগর হাইস্কুল থেকে ১৯৫৮ খ্রিষ্টাব্দে ম্যাট্রিক, ১৯৬০ খ্রিষ্টাব্দে ঢাকা কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট, ১৯৬৩ খ্রিষ্টাব্দে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে বিএ অনার্স এবং ১৯৬৪ খ্রিষ্টাব্দে কৃতিত্বের সঙ্গে মাস্টার্স ডিগ্রি লাভ করেন।
এরপর ১৯৬৬ খ্রিষ্টাব্দে নারায়ণগঞ্জ তোলারাম কলেজের শিক্ষক হিেেসবে পেশাগত জীবন শুরু করেন। ১৯৮০ খ্রিষ্টাব্দে তোলারাম কলেজ সরকারি হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে সেখান থেকে পদত্যাগ করে, রাজধানীর মোহাম্মদপুর কেন্দ্রীয় কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে যোগদান করেন। ২০০৭ খ্রিষ্টাব্দের ৩০ এপ্রিল তিনি মোহাম্মদপুর কেন্দ্রীয় কলেজ থেকে অবসর গ্রহণ করেন। দীর্ঘ ২৬ বছরের অসামান্য অবদানের জন্য তাঁকে সুপারনিউমারারি প্রফেসর পদে নিয়োগ দান করে মোহাম্মদপুর কেন্দ্রীয় কলেজের গভর্নিং বডি। এছাড়াও তিনি তেজগাঁও কলেজ, সঙ্গীত কলেজ, হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজ, নারায়ণগঞ্জ মহিলা কলেজে শিক্ষকতা করেছেন।
প্রফেসর শরীফুল ইসলাম বাংলাদেশ কলেজ শিক্ষক সমিতির জন্মলগ্ন (১৯৭২ খিষ্টাব্দ) হতে মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত মহা-সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে বাংলাদেশ অধ্যক্ষ পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও সভাপতির দায়িত্ব পালনে তিনি সততা ও নিষ্ঠার পরিচয় দিয়েছেন।
আরো পড়ুন:
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্যের বিশেষ সাক্ষাৎকার-প্রথম পর্ব
পিএইচডি একজন শিক্ষকের পূর্ব শর্ত হওয়া উচিত-শেষ পর্ব
১৯৭৮ খ্রিষ্টাব্দে বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনের গঠন প্রক্রিয়ায় তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। তিনি সার্ক টিচার্স ফেডারেশনের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বেসরকরি শিক্ষক কর্মচারীদের পেশাগত দাবি আদায়ের লক্ষ্যে তার নেতৃত্বেই প্রতিষ্ঠিত হয় বেসরকারি স্কুল-কলেজ-মাদরাসার শিক্ষক-কর্মচারী সংগঠন। সেই শিক্ষক-কর্মচারী ঐক্যজোটের প্রধান সমন্বয়কারীর দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
প্রফেসর এম শরীফুল ইসলাম জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ও সিন্ডিকেট সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট সদস্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট ও অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলের সদস্য এবং খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট সদস্য হিসেবে শিক্ষার এবং শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নে প্রশংসনীয় ভূমিকা রেখেছেন। তিনি বিভিন্ন শিক্ষা কমিশনের সদস্য নির্বাচিত হয়ে শিক্ষার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শিক্ষক-কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্টের সদস্য সচিবের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। আবার তিনি বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারী অবসর সুবিধা বোর্ডের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য সচিব হিসেবে এই বোর্ডের কার্যক্রমের সূচনা করেন। শিক্ষক আন্দোলনের পুরভাগে নেতৃত্বদান করতে গিয়ে তিনি অনেক নির্যাতন, নিপীড়ন হয়রানির শিকার হয়েও নীতি ও আদর্শের পথ থেকে বিচ্যুত হননি। বরং নিজ কর্মোদ্দীপনায় চারদিকে ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছিলেন।
আরো পড়ুন:
ঢাবি জনসংযোগ পরিচালকের সাক্ষাৎকার
মানুষের সকল শক্তির উৎস তার শিক্ষার মধ্যেই নিহিত: রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান
শিক্ষক হিসেবে শিক্ষাসেবায় নিয়োজিত থাকার জন্য, ১৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দে স্পেশাল সুপিরিয়র সার্ভিসে মুক্তিযোদ্ধা ক্যাটাগরিতে চাকরি পেয়েও, সেই সুযোগ গ্রহণ করেননি তিনি। কারণ তাতে বেসরকারি শিক্ষকদের অধিকার অর্জনের আন্দোলন ক্ষতিগ্রস্ত হতো। সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষাক্ষেত্রে সুযোগের বৈষম্য নিরসন করে দেশে অভিন্ন নীতিমালার শিক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তন এবং দেশে সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষক কর্মচারীদের জন্য চাকরিবিধি, অভিন্ন বেতন-স্কেলসহ অন্যান্য ভাতা চালুর দাবিতে ১৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দের ১১ মে হতে ১৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মোট ১২৫ দিনব্যাপী শিক্ষক ধর্মঘট তাঁর নেতৃত্বেই হয়েছিলো।
এসময় আলজিয়ার্সে অনুষ্ঠিত জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের চতুর্থ শীর্ষ সম্মেলনে (৫-৯ সেপ্টেম্বর ১৯৭৩) যোগদানের জন্য ঢাকা ত্যাগের প্রাক্কালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান আন্দোলনরত বেসরকারি শিক্ষক নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আলোচনা করেন। বৈষম্য দূরীকরণের লক্ষ্যে তিনি দেশের শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণের দাবি যুক্তিযুক্ত উল্লেখ করে পর্যায়ক্রমে তা বাস্তাবায়নের আশ্বাস দেন এবং বেসরকারি শিক্ষক কর্মচারীদের আর্থিক সঙ্কট লাঘবের জন্যে তাদের রেশনিং সুবিধা প্রদান ও শিক্ষক কল্যাণভাতা বাবদ সরকারি আর্থিক অনুদান মাসিক ৫০ টাকা হতে ১০০ টাকায় উন্নীত করার জন্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে নির্দেশ প্রদান করেন, যা ১৯৭৪ খ্রিষ্টাব্দের ১ জানুয়ারি হতে কার্যকর হয়। তারই পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দের ১৪ সেপ্টেম্বর ঐতিহাসিক শিক্ষক ধর্মঘট প্রত্যাহার করা হয়। তবে প্রফেসর শরীফুল ইসলামের নেতৃত্বে সংগঠনিক কর্মতৎপরতা চলতে থাকে।
ক্রমেই শরীফুল ইসলামের সঙ্গে আমার নিবিড় সম্পর্ক গড়ে ওঠে। আমি তাঁর আন্তরিকতা, আতিথেয়তা, নিষ্ঠা, নিরলস পরিশ্রম, সাংগঠনিক দক্ষতা, তীক্ষ্ণ স্মরণশক্তি, হৃদয়স্পর্শী বাচনভঙ্গি এবং সংগ্রামে অসাধারণ সাহসী ভূমিকা দেখে মুগ্ধ হই।
বেসরকারি শিক্ষকদের পেশাগত সমস্যা সমাধানের জন্যে ১৯৭৬ খ্রিষ্টাব্দে শরীফুল ইসলাম যখন নতুন করে আবারো আন্দোলনের ডাক দেন, তখন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান শিক্ষক নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আলোচনা করে প্রথমে ১৯৭৭ খ্রিষ্টাব্দের ১ জুন হতে শিক্ষক কল্যাণ ভাতা মাসিক ১০০ টাকা হতে ২০০ টাকায় উন্নীত করেন এবং ১৯৭৮ খ্রিস্টাব্দের ১ জানুয়ারি হতে পুনরায় মাসিক ৩২০ টাকায় উন্নীত করেন এবং পরবর্তীতে ৩২০ টাকা হতে ৩৭৫ টাকায় উন্নীত করেন।
এরপর বেসরকারি শিক্ষকদের চাকরিবিধি এবং জাতীয় বেতন-স্কেলে অর্ন্তভুক্তির দাবি বাস্তবায়নে লক্ষ্যে গঠিত এক সদস্য বিশিষ্ট কাজী আনোয়ারুল হক কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের ১৯৮০ খ্রিষ্টাব্দের ১ জানুয়ারি হতে জাতীয় বেতন স্কেলে অন্তর্ভুক্তিসহ প্রারম্ভিক বেতনের ৫০ শতাংশ (যা পর্যায়ক্রমে ২০০৭ খ্রিষ্টাব্দের ১ জুলাই হতে ১০০ শতাংশে উন্নীত হয়েছে) সরকারি কোষাগার হতে প্রদান করা হয়। আবার রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নির্দেশেই অধিকার বঞ্চিত শিক্ষকদের জন্য অভিন্ন চাকরিবিধি প্রণীত হয় এবং ১৯৮০ খ্রিষ্টাব্দের ১ জানুয়ারি হতে তা কার্যকর করা হয়। চাকরিবিধি ও জাতীয় বেতন স্কেলে অন্তর্ভুক্তি বেসরকারি শিক্ষকদের জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন।
আমাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৭১-এর যুদ্ধ-বিধ্বস্ত বাংলাদেশের যেসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, তা সংস্কারের জন্য রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এক কোটি টাকা বরাদ্দ করেন। যে অর্থ হতে ক্ষতিগ্রস্ত বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির ভবন ইত্যাদি মেরামতের জন্য অনুদান দেওয়া হয়। এছাড়া তিনি পর্যায়ক্রমে শিক্ষা ব্যবস্থা জাতীয়করণের প্রতিশ্রুতি দেন।
শিক্ষক আন্দোলন করতে গিয়ে শরীফুল ইসলামকে কারাভোগ করতে হয়েছে। ১৯৮৫ খ্রিষ্টাব্দে সামরিক আইনের সামারি কোর্টে প্রহসনমূলক বিচারে দেশের প্রথম শিক্ষকনেতা হিসেবে সাজাপ্রাপ্ত হন তিনি। ওই দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করে তিনি সসম্মানে মুক্তি লাভ করেন এবং কোর্টের নির্দেশে পুনরায় মোহাম্মদপুর কেন্দ্রীয় কলেজের অধ্যক্ষের পদে বহাল হন।
শিক্ষক আন্দোলনে নেতৃত্ব দানের জন্য বিশেষ ক্ষমতা আইনে (১৯৭৪) ১৯৮৫ খ্রিষ্টাব্দে পুনরায় গ্রেপ্তার হয়ে বিনা বিচারে দীর্ঘদিন কারাবরণ করেন। তিনি ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দে গণআন্দোলনের প্রেক্ষাপটে গঠিত সর্বোস্তরের শিক্ষক সংগঠনের সম্মিলিত মোর্চা, ‘সম্মিলিত শিক্ষক আন্দোলন’ এর যুগ্ম-আহবায়ক এবং সর্বোস্তরের পেশাজীবী সংগ্রাম পরিষদের স্টিয়ারিং কমিটির গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে সাহসিকতাপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
১৯৮১ খ্রিষ্টাব্দে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট রেজিস্টার্ড গ্রাজুয়েট প্রতিনিধি সদস্য নির্বাচনে প্রফেসর এম শরীফুল ইসলামের নেতৃত্বে বাংলাদেশ কলেজ শিক্ষক সমিতি এবং প্রফেসর আলী রেজার নেতৃত্বে সরকারি কলেজ শিক্ষক সমিতি যৌথ প্যানেল প্রদানের মাধ্যমে প্রতিদ্বন্দিতা করে ২৫টি সদস্য পদে বিপুলভাবে জয়লাভ করেন। একই বছরের ১৩ এপ্রিল বঙ্গভবনে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ কলেজ শিক্ষক সমিতির প্রতিনিধিদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন।
আলোচনাকালে প্রতিনিধি দলের নেতা প্রফেসর এম শরীফুল ইসলাম সরকারি শিক্ষকদের পেনশনের অনুরূপ বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য অবসর সুবিধা প্রদানের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি উত্থাপন করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বেসরকারি শিক্ষক কর্মচারীদের অবসর সুবিধা প্রদান অত্যন্ত যুক্তিযুক্ত বলে উল্লেখ করেন এবং তা পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের আশ্বাস দেন।
স্বৈরাচার এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। এসময় শরীফুল ইসলামের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে অবসর সুবিধা আইন প্রণয়নের উদ্যোগটি তৎকালীন সরকারের যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত ছিলো। এজন্য প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া আপামর শিক্ষক-কর্মচারীদের শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা অর্জন করেছেন। তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার ও অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমানের অবদানও স্মরণযোগ্য। তাছাড়াও আইন প্রণয়নে তৎকালীন শিক্ষা সচিব এরশাদুল হক ও অতিরিক্ত সচিব শহীদুল আলম বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেছিলেন। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক প্রফেসর মো. ইউনুস মিয়া, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সহকারী সচিব সৈয়দ জগলুল পাশার নাম উল্লেখযোগ্য।
উল্লেখ্য, বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের চাকরি-জীবন শেষে শূন্য হাতে অবসর নিতে হতো। অথচ সরকারি শিক্ষক-কর্মচারীরা অবসর জীবনে পূর্ণাঙ্গ পেনশন পেয়ে থাকেন। এই বৈষম্য দূর করতেই সরকার বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য অবসর সুবিধা প্রদানের মহতী উদ্যোগ নিয়েছিলেন। এজন্য তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আবদুর রহমান বিশ্বাস ১৯৯৬ খ্রিষ্টাব্দে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের অবসর সুবিধা অর্ডিন্যান্স জারি করেন। ১৯৯৬ খ্রিষ্টাব্দে সরকার পরিবর্তনের পর শিক্ষক কল্যাণধর্মী বেসরকারি শিক্ষক কর্মচারী অবসর সুবিধা অধ্যাদেশ পার্লামেন্টে উত্থাপিত না হওয়ায় তার কার্যকারিতা হারিয়ে যায়।
২০০০ খ্রিষ্টাব্দের ২ জুন, ঢাকার ইঞ্জিনিয়ারিং ইনিস্টিটিউট মিলনায়তনে, শিক্ষকবন্ধু প্রফেসর এম শরীফুল ইসলামের সভাপতিত্বে বাংলাদেশ কলেজ শিক্ষক সমিতি এবং বাংলাদেশ অধ্যক্ষ পরিষদের সহস্রাব্দ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সেই সম্মেলনের বৈকালিক অধিবেশনে প্রধান অতিথি ছিলেন তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। প্রধান অতিথির ভাষণে তিনি বেসরকারি শিক্ষক কর্মচারীদের অবসর সুবিধা বন্ধ করে দেওয়ায় তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন এবং জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে পুনরায় ক্ষমতায় গেলে অবসর সুবিধা পুনঃপ্রবর্তন করবেন বলেও অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছিলেন।
২০০০ খ্রিষ্টাব্দের ২২ জুলাই থেকে বিভিন্ন স্তরের শিক্ষক কর্মচারীর সমন্বয়ে গঠিত ‘শিক্ষক-কর্মচারী ঐক্যজোট’ শিক্ষক-কর্মচারীদের ছয় দফা দাবি বাস্তবায়নের আন্দোলন শুরু করে। একটি সংগঠন আন্দোলনের বিরোধিতা করলেও ‘শিক্ষক কর্মচারী ঐক্যজোট’ ছয় দফা বাস্তবায়নের জন্য সভা, সমাবেশ, মিছিল, ধর্মঘট চালানোর মাধ্যমে আন্দোলন চালাতে থাকে এবং আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ে ২০০১ খ্রিষ্টাব্দের ২ জুলাই কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে অবস্থান ধর্মঘট এবং ৩ জুলাই আমরণ অনশন শুরু করে।
তৎকালীন সরকার এই ব্যাপারে কোনো সাড়া না দিলেও, জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ৬ জুলাই ২০০১ খ্রিষ্টাব্দে ওমরা হজ শেষে দেশে ফিরে সরাসরি কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে উপস্থিত হন। এসময় তিনি অনশনরত শিক্ষক-কর্মচারীদের দাবির প্রতি সমর্থন ঘোষণা করেন এবং অবসর সুবিধা পুনঃপ্রবর্তন ও বেতন-স্কেলের ১০০ শতাংশ প্রদানসহ অন্যান্য ন্যায্য দাবি-দাওয়া বাস্তবায়নের আশ্বাস প্রদান করেন। তখন শিক্ষকগণ অনশন ভঙ্গ করেন। এরপর ২০০১ খ্রিষ্টাব্দের জাতীয় নির্বাচনে জনগণের সমর্থনে বিজয় লাভ করে সরকার গঠনের পর, প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার প্রতিশ্রুতি মোতাবেক তাঁর সরকার বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারী অবসর সুবিধা প্রকল্প আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করে।
শিক্ষাক্ষেত্রে বিরাজমান বৈষম্য নিরসন, বেসরকারি শিক্ষকদের অভিন্ন চাকরিবিধি প্রবর্তন, জাতীয় বেতন স্কেলে অন্তর্ভুক্তি, উৎসব ভাতা প্রাপ্তির ব্যবস্থাকরণ, পাবলিক পরীক্ষায় নকলমুক্ত পরিবেশ প্রবর্তনে সক্রিয় ভূমিকা পালন, শিক্ষা ও সমাজকল্যাণধর্মী আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনে বাংলাদেশ কলেজ শিক্ষক সমিতি ও বাংলাদেশ অধ্যক্ষ পরিষদকে সঠিক ও বলিষ্ঠ নেতৃত্ব দিয়েছিলেন প্রফেসর এম শরীফুল ইসলাম। তিনি গুণগত শিক্ষার ওপর অধিকতর প্রাধান্য দিয়েছেন। সরকারি শিক্ষকদের অনুরূপ বেসরকারি শিক্ষকদেরকেও যোগ্যতা, মেধা ও জ্যেষ্ঠতা অনুযায়ী শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন তিনি। শিক্ষার মানোন্নয়নে বেসরকারি শিক্ষক নিয়োগ ব্যবস্থা সুষ্ঠু ও যথাযথ প্রক্রিয়ায় পরিচালনার জন্য পিএসসির মতো পৃথক শিক্ষা সার্ভিস কমিশন গঠন এবং ওই কমিশনের মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ করার দাবি জানান। তাছাড়া শিক্ষকদের জন্য ট্রেনিং, বিদেশে উচ্চ শিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ প্রদানের জন্য প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছিলেন।
বেসরকারি শিক্ষক ও কর্মচারীদের জন্য অবসর সুবিধার ধারণা একান্তভাবেই তাঁর এবং এজন্যই তাঁকে ‘অবসর সুবিধার রূপকার’ পদবিতে ভূষিত করা হয়। তিনি বেসরকারি শিক্ষকদের বেতন শূন্য থেকে ৫০ শতাংশ সরকারি কোষাগার হতে আদায়ের ব্যবস্থা করেছিলেন। এখন তা শতভাগে উন্নীত হয়েছে মূলত তাঁরই অক্লান্ত প্রচেষ্টা ও দূরদর্শী পরিকল্পনার কারণে।
শিক্ষক নেতা ও শিক্ষা ব্যবস্থাপক প্রফেসর এম শরিফুল ইসলাম একজন সৎ, নিষ্ঠাবান, দায়িত্ব সচেতন, পরোপকারী, স্পষ্টবাদী ব্যক্তি এবং সর্বদাই তিনি নীতির প্রশ্নে আপসহীন ছিলেন। তাঁর দূঢ়তার কারণেই দেশব্যাপী শিক্ষক সংগঠন বাকশিস ও বিপিসি গঠন এবং তা পরিচালনা করতে সক্ষম হয়েছেন। আপামর শিক্ষকদেরকে সঙ্গে নিয়ে, গতিশীল নেতৃত্বের মাধ্যমে শিক্ষকদের ন্যায়সঙ্গত ও যুক্তিযুক্ত অধিকার আদায়ে সফলতা অর্জনেও সক্ষম হয়েছেন। অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে কখনও শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারীদেরকে সম্পৃক্ত করেছেন, আবার কখনও ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের জন্য অন্যান্য শিক্ষক সমিতির সঙ্গে ঐক্যজোট গঠন করে নিয়মতান্ত্রিকভাবে আন্দোলনের মাধ্যমে অধিকার আদায় করেছেন। তিনি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিক্ষক সংগঠনের আমন্ত্রণে বিভিন্ন দেশ সফর করেছেন এবং তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে নিজের সংগঠনকে কীভাবে আরও শক্তিশালী ও কার্যকর করা যায়, সেই বিষয়ে পদক্ষেপ নিতেন।
তাঁর প্রতিষ্ঠিত শিক্ষক সংগঠন যখন একটা উন্নতির শিখরে পৌঁছেছে, ঠিক সেই মুহূর্তে তাঁর জীবনের অবসান ঘটে। অগণিত শুভাকাঙ্খীকে শোকসাগরে ভাসিয়ে ২০০৮ খ্রিষ্টাব্দের ২ ডিসেম্বর তিনি ইহলোক ত্যাগ করেন। ব্যক্তি শরীফুল ইসলাম ইহলোক ত্যাগ করলেও তাঁর সংগঠন, কর্মপ্রেরণা, অবদান আজও আমাদের মাঝে বেঁচে আছে। আমরা তাঁর আত্মার মাগফেরাত কামনা করি।
লেখক: সভাপতি, বাংলাদেশ অধ্যক্ষ পরিষদ ও প্রাক্তন ট্রেজারার, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়