
১০ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া এসএসসি পরীক্ষা পেছানোর দাবিতে সারাদেশে অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিয়েছেন শিক্ষার্থীরা, এটি কার স্বার্থে! শিক্ষার্থীরা কেনো আবার নিজেদের ধ্বংস নিজেরাই ডেকে আনতে যাচ্ছেন, তা আমাদের বোধগম্য নয়।
তাদের যে অন্যকোনো পক্ষ ব্যবহার করতে যাচ্ছেন সেটি বোঝার বয়স এখনো তাদের হয়নি। আমরা জানি, এসএসসি পরীক্ষা ইতোমধ্যে এক দুইবার পিছিয়েছে।
সর্বশেষ, সংশোধিত রুটিন অনুযায়ী ১০ এপ্রিল থেকে পরীক্ষা শুরু হবে এবং চলবে ১৩ মে পর্যন্ত। আর ব্যবহারিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে ১৫ মে থেকে ২২ মে পর্যন্ত। তার মানে হচ্ছে প্রায় দুই মাস যাবত পরীক্ষা চলবে।
কোমলমতি শিক্ষার্থীদের কথামতো পরীক্ষা আবারও পেছালে সেটি শেষ হতে যে কতমাস লাগবে সেই হিসাব কি তারা কষছেন! তারা কষেননি তবে যারা তাদের ব্যবহার করতে চাচ্ছেন তারা ঠিকই কষেছেন এবং বোঝাই যাচ্ছে যে, এই শিক্ষার্থীদের একটি অ্যাকাডেমিক ইয়ার ধ্বংসের পাঁয়তারা চলছে! শিক্ষার্থীদের দুটি দাবি হলো- পরীক্ষা একমাস পেছানো এবং সব পরীক্ষায় ৩-৪ দিন বন্ধ রাখা। পরীক্ষা কেনো পেছাতে হবে!
পরীক্ষার্থীরা বলছেন, রমজান মাসে রোজা রেখে ভালোভাবে পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া সম্ভব হয়নি।
দ্বিতীয়ত, ঈদের পরপরই পরীক্ষা হওয়ায় পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। রমজান মাসে তো শিক্ষার্থীরা সারাদিনই নামাজ-রোজা করেননি যে, পড়ার একেবারে সময়ই পাননি। পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হবে। বরং রমজান মাসেই শিক্ষার্থীরা যেসব বিষয়ে পিছিয়ে থাকেন, সেসব বিষয় ভালোভাবে পড়েন, প্রাইভেট পড়েন।
এটি শিক্ষাজীবনে দেখেছি, এখনও তাই হচ্ছে। রমজানের কারণে পরীক্ষা পেছানোর কোনো যুক্তি নেই। শিক্ষার্থীদের পরিবেশ ও পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হবে, এটি জীবনে একটি বড় শিক্ষা!
ঈদের পরপরই পরীক্ষা মানে কি, ঈদ গেছে ৩১ মার্চ। পুরো নয়দিন সময় পাওয়া যাচ্ছে। এই সময়টুকু ভালোভাবে কাজে লাগালে পরীক্ষা ভালোভাবেই দেওয়া সম্ভব। সময়ের মূল্যই যদি শিক্ষার্থীরা না বোঝেন, তাহলে পড়ালেখা কীসের জন্য! পুরো বই তো তাদের নয় বা ১০ দিনে রিভাইজ দিতে হবে না। তারা বরং প্রথম দিনের অতিরিক্ত হলে দ্বিতীয় দিনের বিষয়ের প্রস্তুতি নেবেন।
কাজেই এক বা দুই বিষয়ের রিভিশন দিতে তো একমাস লাগার কথা নয়! আর পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া মানে কি শুধু কিছু প্রশ্ন মুখস্থ করে লিখে দিয়ে আসা!
যুগ পাল্টেছে, শিক্ষার্থীদের সেই অবস্থার সঙ্গে পরিচিত হতে হবে। কোনো বিষয়ের ভালো ধারণা নিয়ে নিজ থেকে লেখা, যুক্তি-তর্ক উপস্থাপন করা এবং সামান্য কিছু বিষয় মুখস্থ করা। এসব চিন্তায় না এনে পরীক্ষাকে বাধাগ্রস্ত এবং দীর্ঘায়িত করা কেনো! পরীক্ষা শেষ করে বরং ভারমুক্ত হওয়াটাই শিক্ষার্থীদের বুদ্ধিমানের কাজ হবে। জীবনের পরবর্তী স্তরের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করতে হবে। কারণ, সময় কারোর জন্যই অপেক্ষা করে না।
আর রাস্তায় ঘণ্টার পর ঘণ্টার তীব্র গরমে আন্দোলন করতে নেমে যে সময় নষ্ট হবে, শারীরিক ও মানসিক সমস্যায় পড়বে তা অনেক শিক্ষার্থীদের দীর্ঘ মেয়াদী ক্ষতির কারণও হতে পারে। কাজেই, এ ধরনের আত্ম-বিধ্বংসী কাজে নিজেদের নিয়োজিত রাখা শিক্ষার্থীদের জন্য মোটেই উপকারী কোনো পদক্ষেপ বা সিদ্ধান্ত নয়। এর পেছেনে যারা আছেন তারা তাদের ফায়দা লোটার চেষ্টা করছেন কিন্তু শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে যাবেন, সেটি তাদের অবশ্যই ভাবা উচিত।
একটি পাবলিক পরীক্ষার রুটিন করতে বহুদিক চিন্তা করতে হয়, বহু পারমুটেশন ও কম্বিনেশন করে একটি রুটিন সেট করা হয়। প্রতিটিতে ৩-৪ দিন বন্ধ রাখা মানে একটি পরীক্ষার জন্য কয়েকমাস সময় বরাদ্দ রাখা। সেটি তো সম্ভব নয়। কারণ বোর্ডগুলোকে এসএসসি পরীক্ষার উত্তরপত্র সংগ্রহ, পরীক্ষকদের মাঝে বিতরণ, ফল তৈরিসহ বহু কাজ করতে হয়। তারপর আবার এইচএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে হয়। শুধু এসএসসি পরীক্ষার জন্যই যদি কয়েকমাস বরাদ্দ রাখা হয়, তাহলে কখন এইচএসসি পরীক্ষার ফর্মালিটিগুলো শেষ করা যাবে? তার মানে পুরো শিক্ষাবছরই তালগোলের মধ্যে চলে যাবে যা থেকে শিক্ষার্থীরা আর বের হতে পারবেন না। তাদের যে ক্ষতি হবে সেটি তারা এখন বুঝতে পারছেন না।
শিক্ষার্থীরা বলতে চাচেছন যে, গরমের কারণে একটানা পরীক্ষা দেওয়া সম্ভব নয়! এটিও একটি অযৌক্তিক দাবি কারণ এখনো গরম অতটা পড়া শুরু হয়নি। শিক্ষার্থীরা যে দাবি করছেন তাতে অসহনীয় গরম এসে যাবে যদি পরীক্ষা পেছানো হয় যখন বহু মানুষ গরমে অসুস্থ হয়ে পড়েন। এটি তারা কেনো করতে চাচ্ছেন! তাছাড়া গরমের দিন আসা মানে বড় বড় ঝড়, বৃষ্টিসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগে আক্রান্ত হওয়ার আতঙ্ক থেকে যায়। তখন দেখা যাবে, প্রায় দিনই নির্ধারিত পরীক্ষাও পেছাতে হবে। এভাবে করতে থাকলে পরীক্ষা আদৌ শেষ করা যাবে কিনা এ বছর সেটি আরেকটি বড় প্রশ্ন! কাজেই এই অযৌক্তিক দাবি থেকে শিক্ষার্থীদের সরে আসার অনুরোধ করছি।
আর এসএসসি একটি পাবলিক পরীক্ষা! দেশের এটিই একমাত্র কাজ নয় যে, শিক্ষার্থী অভিভাবক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষাবোর্ড, মাউশি অধিদপ্তর তথা মন্ত্রণালয়কে শুধু এটি নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হবে। এসএসসি পরীক্ষা পেছালে এইচএসসি পরীক্ষা আরো কয়েকমাসে পেছাতে হবে, ফলে পুরো শিক্ষাচক্র আরো ক্ষতির মুখে পড়বে। কোভিডের কারণে শিক্ষার্থীরা সময়ের হিসেবে দুই বছর মূলত তারা পিছিয়ে গেছেন ছয় থেকে আট বছরের মতো। তারপর তথাকথিত নতুন কারিকুলামের নামে আরো দুই বছর সেটিও বলা যায় আরো ছয় থেকে আট বছর পিছিয়ে গেছে। এত বড় বিশাল গ্যাপ কোনোভাবেই পূরণ হওয়ার নয়। আবার নতুন ধরনের শিক্ষাচক্র ধ্বংস হওয়ার ষড়যন্ত্র থেকে শিক্ষার্থীদের সরে আসতে হবে তাদের নিজেদের স্বার্থে, পরিবার তথা দেশের স্বার্থে।
আবার যদি পরীক্ষা পেছানোর মতো ধ্বংসাত্মক কাজ শিক্ষার্থীরা করে তাহলে বলা যায়, নিজেদের ধ্বংস নিজেরাই ডেকে আনবেন। তাই সব অভিভাবক, সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সব শিক্ষকদেরকে শিক্ষার্থীদের এই ধ্বংসাত্মক কাজ থেকে বিরত থাকার জন্য মুটিভেট করতে হবে, বোঝাতে হবে। আর শিক্ষা বোর্ড ও মন্ত্রণালয়কে কঠোর হতে হবে কারণ এই কচি ছেলে-মেয়েদের অন্যায় আবদার শুনে তাদের জীবনে অমানিশার ঘোর অন্ধকার ডেকে আনতে দেওয়া ঠিক হবে না। যেমনটি- বাবা-মা সন্তানদের অন্যায়-আবদার সব সময় শোনেন না এবং প্রয়োজনে কঠোর সিদ্ধান্ত নেন যা সন্তানরা বড় হওয়ার পরে বোঝে।
লেখক: ক্যাডেট কলেজের সাবেক শিক্ষক