ঢাকা শনিবার, ০৫ এপ্রিল ২০২৫ , ২১ চৈত্র ১৪৩১ আর্কাইভস ই পেপার

bkash
bkash
udvash
udvash
uttoron
uttoron
Rocket
Rocket
bkash
bkash
udvash
udvash

চাই শিশুশিক্ষা উপযোগী শিক্ষাব্যবস্থা

মতামত

গুরুদাস ঢালী, আমাদের বার্তা

প্রকাশিত: ০৮:৩০, ৫ এপ্রিল ২০২৫

সর্বশেষ

চাই শিশুশিক্ষা উপযোগী শিক্ষাব্যবস্থা

শিক্ষকতা শুধু একটি পেশা নয়, এটি একটি ব্রত। একজন শিক্ষক সারাজীবন অন্যের জন্য উৎসর্গ করে দেন শিক্ষার্থীদের জ্ঞান বিতরণ করেন, তাদের মানুষ গড়ার কারিগর হন, সমাজের জন্য দক্ষ নাগরিক তৈরি করেন। কিন্তু নিজের জন্য কি কিছু করেন? অধিকাংশ শিক্ষক জীবনের শেষ প্রান্তে এসে দেখেন, অন্যের ভবিষ্যৎ গড়তে গিয়ে নিজের জীবনটাই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

বেতন কাঠামোর দুর্বলতা, অবসরকালীন ভাতার জটিলতা, আর্থিক সংকট এসবের মাঝে তাদের বার্ধক্য কাটে উপেক্ষিত অবস্থায়। অথচ তার গড়া শিক্ষার্থীরাই সমাজের উচ্চ আসনে প্রতিষ্ঠিত হন। জীবনের শেষ সময়ে এসে একজন শিক্ষক যখন নিজের প্রতি একটু যত্ন নিতে চান, তখন হয়তো আর সুযোগ থাকে না। 

তার জীবন যেনো এক নিঃস্বার্থ তর্পণ, যেখানে নিজের জন্য কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। তবুও তার মুখে সবসময় লেগে থাকে এক তৃপ্তির হাসি। কারণ, তিনি জানেন, তার হাতে গড়া ছাত্ররাই একদিন দেশের মুখ উজ্জ্বল করবে। এই নির্মম বাস্তবতা শিক্ষকদের ত্যাগের প্রকৃত মূল্যায়নকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরেও শিক্ষকদের চোখের জল মুছতে পারিনি। তাই আজ সুযোগ হয়েছে কিছু করার। জানি না হবে কি না। আগের প্রজম্মের শিক্ষকদের জন্য তো হলো না। যদি এ প্রজম্মের শিক্ষকরা এ অভিশাপ থেকে মুক্তি পান।

আমরা জানি এ অভিশাপ থেকে তাদের মুক্তি নেই। কারণ, দেশে কোনোদিন স্বাধীন শিক্ষা কমিশন হবে না! স্বাধীন শিক্ষা কমিশন হলো একটি স্বতন্ত্র সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান, যা শিক্ষানীতি, শিক্ষার মানোন্নয়ন, শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা প্রণয়নের জন্য কাজ করে। এটি সাধারণত কোনো নির্দিষ্ট সরকার বা রাজনৈতিক দলের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থেকে স্বাধীনভাবে শিক্ষা সংক্রান্ত গবেষণা, বিশ্লেষণ ও সুপারিশ দেয়।

আমাদের দেশে বিভিন্ন সময়ে সরকার শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নে কমিশন গঠন করেছে, ড. কুদরাত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশন (১৯৭২), মজিদ খান শিক্ষা কমিশন (১৯৮৮), ড. মুহম্মদ শামসুল হক শিক্ষা কমিশন (১৯৯৭), এবং জাতীয় শিক্ষা কমিশন (২০১০)। তবে স্বাধীন শিক্ষা কমিশন বলতে একটি রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, স্বতন্ত্র ও নিরপেক্ষ সংস্থা বোঝায়, যা এখনো বাংলাদেশে গঠিত হয়নি। যদি একটি স্বাধীন শিক্ষা কমিশন গঠিত হয়, তবে এটি সরকারের নির্দেশনা ছাড়াই গবেষণাভিত্তিক সুপারিশ দিতে পারবে এবং শিক্ষাব্যবস্থা উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে। যেটা বর্তমানে আমাদের জন্য সবচেয়ে আগে দরকার।

শিক্ষক নিয়োগে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় আমাদের দেশে সবচেয়ে নীতি গর্হিত কাজটা করা হয়। মেধা কে কোনোরকম পাত্তা না দিয়ে টাকার বিনিময়ে তথাকথিত মেধাশূন্য শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হয়, যার ফলে দিনদিন স্কুলে শিক্ষার্থী শুন্য হয়ে যাচ্ছে। সাধারণ অভিভাবকদের অসচেতসতার দোহাই দিয়ে পার পেয়ে যাচ্ছে। আজ আমাদের শিক্ষা প্রশ্নবিদ্ধ। উত্তর জানা নেই। বর্তমানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে, বার্ষিক প্রাথমিক বিদ্যালয় শুমারি (এপিএসসি)-২০২৩ অনুসারে সর্বমোট শিক্ষক আছেন ৩ লাখ ৮৪ হাজার ৫১৩ জন, এইচএসসি পাস শতকরা ১৫ জন, গ্র্যাজুয়েট সমাপ্ত করা শতকরা ৩৭ জন আর পোস্ট গ্র্যাজুয়েট সমাপ্ত করা আছেন শতকরা ৪৭ জন।

মোট শিক্ষক শিক্ষিকার অর্ধেকের বেশি গ্র্যাজুয়েট সমাপ্ত করা। আমরা জানি বিভিন্ন সময়ে দেখেছি ভালো, মেধাবীও দক্ষ ব্যক্তি শিক্ষক শিক্ষক হিসাবে সুপারিশ প্রাপ্ত হন। বেতন কাঠামো আর নোংরা পরিবেশের কারণে তারা ভালো সুযোগ পেয়ে অন্যত্র চলে যান। ফলে যতো দ্রুত যোগদান করেন ততো দ্রুত তারা চলেও যান। আবার সেই পদ শূন্য হয়। বর্তমানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য আছে ৩২ হাজার আর সহকারী প্রাথমিক শিক্ষকের পদ শূন্য আছে ১৭ হাজার।

প্রধান শিক্ষকের শূন্য পদ কেনো থাকবে। লাখ লাখ সহকারী শিক্ষকের কেউ কি এ পদে আসতে পারেন না। সংস্কার কমিশনকে এখানে স্বাধীনভাবে কাজ করতে হবে। চাকরির বয়স ৫ বছর পর থেকে সিলেকশন প্রসেসের মাধ্যমে মেধাবী, দক্ষ, যোগ্য শিক্ষকের তালিকা তৈরি করতে হবে, যাতে কোনোভাবে পদ খালি না থাকে। রাজনৈতিক চাটুকারিতাকে শূন্যে আনতে হবে। কোনোভাবে যেনো কোনো শিক্ষক তার সীমাবদ্ধতা, যোগ্যতা সহযোগিতার ও উশৃঙ্খলার সর্বোচ্চ স্তরে না পৌঁছাতে পারেন।

একটা স্কূল বা শ্রেণি তখন প্রাণবন্ত হবে যখন শ্রেণি ব্যবস্থাপনা মুল্যায়নের মানদণ্ডে সবার উপরে অবস্থান করবে। আমাদের স্কুলগুলোতে দেখি শিশু নেই। কিন্তু কেনো? দায়বদ্ধতা কার? শিশুর, অভিভাবকের, শিক্ষকের না রাষ্ট্রের। দোষ কারো না কিন্তু রাষ্ট্র প্রণীত শিক্ষাব্যবস্থাকে যারা অজুহাতের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়ে দায়বদ্ধতাকে নির্বাসনে দিচ্ছে তাদের। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে স্কুল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, সরকারকে বন্ধ করার প্রস্তাব পাঠানো হয়। কিন্তু কেনো। শিশু তো স্কুলে আসে, সে স্কুলে আসতে চায়। আমাদের ব্যর্থতা যে তাদের মনের মতো হতে পারিনি। 

তাদের আন্দোলিত করার পরিবেশ তৈরি করতে আমরা অপরাগ। কোনো স্কুলে শত শত শিক্ষার্থী আবার রেজাল্টও ভালো। আমাদের মানসম্মত ব্যবস্থাপনা, জবাবদিহিতা ও দায়বদ্ধতার চরম অভাবে শিশুর জীবন ‍ও শিক্ষা আজ প্রশ্নবিদ্ধ। বার্ষিক প্রাথমিক বিদ্যালয় শুমারি (এপিএসসি)-২০২৩ অনুসারে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ঝরে পড়ার হার: প্রথম শ্রেণিতে ২ দশমিক ৫ জন, দ্বিতীয় শ্রেণিতে ২ দশমিক ৬ জন, তৃতিয় শ্রেণিতে ৩ দশমিক ৯ জন, চতুর্থ শ্রেণিতে ৪ দশমিক ৫ জন ও পঞ্চম শ্রেণিতে দশমিক ১ জন। এখানে স্পষ্ট, আমরা শিশুদের স্কুলে ধরে রাখার মতো কোনো বিশেষ চিত্তাকর্ষক কিছু করতে পারছি না।

কেনো পারছি না এটা তো সবার কাছে পরিষ্কার। তবে সবার জন্য নয়। আমাদের ব্যর্থতা শিশু স্কুলে আসে না, বা আসতে চায় না। আমরা ওদেরকে বা অভিভাবককে দেখানোর মতো সব কাজ হারিয়ে ফেলেছি, ফলে আজ নিজেদের হারাতে বসেছি। এ থেকে উত্তরণে সবার জবাবদিহিতা থাকতে হবে। দায়বদ্ধতাকে পাশ কাটিয়ে অন্যকে দোষ চাপিয়ে নিজেকে আড়াল করা যাবে না। প্রযুক্তি ও পাঠ প্রতিনিয়ত পরিবর্তন হচ্ছে। নিজেকে মিলিয়ে নিতে হবে। আমি সরকারি চাকুরে বলে দায় এডানো যাবে না।

শ্রেণিকক্ষে নিরাপদ, স্বাচ্ছন্দ্যবোধ ও শেখার পরিবেশ আকর্ষণীয় করা, শ্রেণিকক্ষ রঙিন ও সৃজনশীলভাবে সাজানো থাকলে শিশুরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করতে আগ্রহী হয়। পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি চার্ট, ফ্ল্যাশকার্ড, ছবি ও মডেল ব্যবহার করলে শিশুদের শেখার আগ্রহ বাড়ে। ইন্টার-অ্যাক্টিভ শিখন কৌশল প্রয়োগ করা প্রশ্নোত্তর পদ্ধতি, গল্প বলা, অভিনয়, নাটক ও খেলাধুলার মাধ্যমে শেখানো। গ্রুপ ওয়ার্ক ও পিয়ার লার্নিংয়ের সুযোগ রাখা। শিশুর মতামতকে গুরুত্ব দেয়া শিশুদের মতামত শুনে তা শ্রেণি ব্যবস্থাপনায় অন্তর্ভুক্ত করা। শিশুরা যাতে নিজেদের সিদ্ধান্ত নিতে পারে, সেই সুযোগ তৈরি করা।

খেলাধুলা ও সৃজনশীল কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত করা গেমবেসড লার্নিং, গান, নাচ, গল্প বলা, আর্ট ও ক্রাফট শেখার অংশ হতে পারে। ব্রেইনস্টর্মিং ও সমস্যা সমাধানের চর্চা করানো। বিভিন্ন শিক্ষণ পদ্ধতি ব্যবহার করা শ্রেণিতে শ্রবণ, দৃষ্টিনির্ভর, স্পর্শনির্ভর ও অনুশীলনমূলক শেখার পদ্ধতি ব্যবহার করা। শিশুরা ভিন্ন ভিন্ন শিক্ষার পদ্ধতিতে শিখতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে, তাই তাদের জন্য বিভিন্ন শিক্ষণ পদ্ধতি প্রয়োগ করা প্রয়োজন। ট্যাবলেট বা শিক্ষামূলক অ্যাপ, শিশুদের আকৃষ্ট করতে পারে। ভিজ্যুয়াল ও ইন্টার-অ্যাক্টিভ কনটেন্ট ব্যবহার করে শেখার প্রক্রিয়াকে আকর্ষণীয় করুন।

আমাদের প্রাথমিকের শিক্ষার অবকাঠামো ভালো, শিক্ষকরা মানসম্পন্ন, পড়াশোনায় অগ্রসর, বেতন কাঠামো মোটামুটি ভালো, চাকরির নিশ্চয়তা আছে। অন্য সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এসব সুযোগ-সুবিধা তুলনামূলকভাবে কম। তারপরও অভিভাবকরা কেনো তাদের শিশুদের অন্য বিদ্যালয়ে পড়াবেন? প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে সমস্যা কোথায়? কীভাবে উন্নয়ন করতে পারি সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট মতামত আশা করছি। গত ২২ মার্চে ময়মনসিংহের টাউন হলের তারেক স্মৃতি অডিটরিয়ামে প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে জেলার বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারের সঙ্গে মতবিনিময়সভায় প্রধান অতিথির বক্তৃতায় গণশিক্ষা উপদেষ্টা এসব কথা বলেন।

বিভাগীয় কমিশনার মো. মোখতার আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য দেন প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবু নূর মোহাম্মদ শামসুজ্জামান, জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমির মহাপরিচালক ফরিদ আহমদ, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক (পলিসি ও অপারেশন) মোহাম্মদ কামরুল হাসান, জেলা প্রশাসক মফিদুল আলম, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর ময়মনসিংহ বিভাগের বিভাগীয় উপপরিচালক মো. জালাল উদ্দিন, ময়মনসিংহ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. ওবায়দুল্লাহ।

ময়মনসিংহ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস আয়োজিত মতবিনিময় সভায় প্রাইমারি টিচার্স ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের সুপার, উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার, সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসার, ইউআরসি ইন্সট্রাক্টর, সহকারী ইন্সট্রাক্টর, প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকরা অংশ নেন। রাষ্ট্রের এতবড় কর্মক্ষেত্রে সবাই কাজ করে কিন্তু যাকে সবচেয়ে বেশি দরকার ছিলো সেই মানুষের কোনো অবস্থান নেই। যে বাস্তবায়ন করে তার চোখে অনেক কিছু ধরা নাও পড়তে পারে। আবার বাস্তবায়নে যা দেয়ার কথা ছিলো তা পরিপূর্ণভাবে নাও দিতে পারেন। দেখেন শিক্ষাদান আর গ্রহণে যদি সুষ্ঠু সমন্বয় না হয় তাহলে জান চলে চলে যাবে কিন্তু মান আসবে না।

দেহে প্রাণ না থাকলে তাকে আস্তাকুড়ে ফেলে দেয়। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা কোথায় যেয়ে শেষ, বলা মুশকিল। এখানে জেলা স্তরের কর্মকর্তারা ও দৃশ্যমান অনিয়ম অপরাধ করেন। উপজেলা স্তরে কর্মকর্তা ও ছুটি দিতে বাহানা করেন। প্রধান শিক্ষক সংস্কারের, উপবৃত্তির টাকা মারেন। সহকারী ও প্রধান শিক্ষক যোগসাজশে বই বিক্রি করে দেন। স্কুল না থাকে থাকুক, শিক্ষার্থী না থাকে থাকুক, লেখাপড়া না হয় হোক চাকরি থাকলেই হবে!

আমরা কাউকে দোষারোপ করছি না। শুধু তত্ত্ব কথার ভিড়ে লেখাপড়া শেষ, শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংস হওয়ার পথে। আমরা এর শিকার। সবাই সবার অপরাধ, ব্যর্থতা ও অনিয়মগুলো ঢাকার জন্য তার বসের দ্বারস্থ হন। সবকিছু ম্যানেজ হয়ে যায়. কিন্তু শিশু বা শিক্ষার্থী, সে কাকে ম্যানেজ করবে। তার অপরাধ কী? পড়ালেখা করতে চাওয়া তার অপরাধ?

লেখক: বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায় কর্মরত

 

জনপ্রিয়