
মানবজীবনে উদারতা ও সহিঞ্চুতা এক মহান গুণ। এর দ্বারা পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র সবখানেই বজায় থাকে স্থিতিশীলতা ও শান্তি। উদারতা ও ছাড় দেওয়ার মানসিকতা না থাকলে কোথাও স্বস্তি মিলে না। ইসলাম উদারতার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। সব মত, পথ ও ধর্মের সহাবস্থানের জায়গাটি হলো ইসলাম। বিগত দেড় হাজার বছর ধরে ইসলাম উদারতা, মানবিকতাবোধ, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সহিষ্ণুতার অপূর্ব নজির স্থাপন করে আসছে। ঐতিহাসিক ‘মদিনা সনদ’ উদারতার এক ঐতিহাসিক দলিল।
সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় ইসলাম যে উদাহরণ স্থাপন করেছে এর কোনো নজির নেই। বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সহমর্মিতা ও সদ্ব্যবহার ইসলামের অনুপম শিক্ষা। অমুসলিমদের সঙ্গে সদাচরণ ও সৌহার্দ্য প্রতিষ্ঠা পবিত্র কোরআনের নির্দেশ। রাসুল (সা.) তার ২৩ বছরের নবুয়তি জীবনে অমুসলিমদের সঙ্গে সহাবস্থানের বাস্তব নমুনা স্থাপন করে গেছেন। উদারতার এক জ্বলন্ত প্রতীক ছিলেন প্রিয়নবী (সা.)। জগদ্বাসীর সামনে তিনি ক্ষমা ও উদারতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন।
ইসলাম সহিঞ্চুতা, সম্প্রীতি ও মানবতার ধর্ম। ইসলাম বিস্তৃতি লাভ করেছে তার আদর্শের শক্তিতে, তলোয়ারের জোরে নয়। ইসলামের নবী এবং তাঁর সহযোগী সাহাবায়ে কেরামের আদর্শই হলো মূল শক্তি। অল্প দিনে ইসলাম অর্ধেক পৃথিবী জয় করার পেছনে মূল শক্তিটি ছিল আদর্শের, উদারতার। পৃথিবীর আর কোনো ধর্ম বা মতাদর্শ এত উদারতা দেখাতে পারেনি, যা দেখিয়েছে ইসলাম এবং ইসলামের নবী।
কোরআনে বলা হয়েছে, ‘যারা তোমাদের সঙ্গে ধর্মকেন্দ্রিক যুদ্ধ করেনি এবং তোমাদেরকে তোমাদের ঘরবাড়ি থেকে উচ্ছেদ করেনি তাদের সঙ্গে সদাচরণ করতে এবং তাদের প্রতি ইনসাফ করতে আল্লাহ তোমাদের নিষেধ করেননি। নিশ্চয়ই আল্লাহ ইনসাফকারীদের ভালোবাসেন।’ (সুরা আল মুমতাহিনা : ৮) আল্লাহ বলেন, ‘তারা আল্লাহ তায়ালার বদলে যাদের ডাকে, তাদের তোমরা কখনও গালি দিও না, নইলে তারাও শত্রুতার কারণে না জেনে আল্লাহ তায়ালাকেও গালি দেবে, আমি প্রত্যেক জাতির কাছেই তাদের কার্যকলাপ সুশোভনীয় করে রেখেছি, অতঃপর সবাইকে একদিন তার মালিকের কাছে ফিরে যেতে হবে, তারপর তিনি তাদের বলে দেবেন, তারা দুনিয়ার জীবনে কে কী কাজ করে এসেছে।' (সূরা আনআম : ১০৮)। রাসুল (সা.) বলেন, ‘সাবধান! যে ব্যক্তি চুক্তিবদ্ধ সম্প্রদায়ের কোনো ব্যক্তির ওপর জুলুম করবে বা তার প্রাপ্য কম দিবে কিংবা তাকে তার সামর্থ্যরে বাইরে কিছু করতে বাধ্য করবে অথবা তার সন্তুষ্টিমূলক সম্মতি ছাড়া তার কাছ থেকে কিছু গ্রহণ করবে কিয়ামতের দিন আমি তার বিপক্ষে বাদী হব। (আবু দাউদ শরিফ : ৩০৫২)
প্রকৃতির ধর্ম ইসলাম মানুষের ভেতরে তার প্রকৃতিগত গুণ তথা মনুষ্যত্বের বিকাশ ঘটিয়েছে। ইসলামের শিক্ষা হলো, প্রথমে ভালো মানুষ হতে হবে, পরে ভালো মুসলমান। যিনি ভালো মুসলমান তিনি ভালো মানুষও বটে। হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী, ঈমান না আনা পর্যন্ত জান্নাতে যাওয়া যাবে না। আবার পরস্পরকে ভালোবাসতে না পারা পর্যন্ত ঈমানদার হওয়া যাবে না। প্রকৃত ঈমানদার হতে হলে মানবপ্রেম অন্তরে জাগাতে হবে। মানুষের প্রতি দায়বোধ বাড়াতে হবে। শুধু মানুষই নয়, প্রতিটি প্রাণীর প্রতি দয়া প্রদর্শন করতে হবে। মানবকল্যাণে যিনি কাজ করেন তিনিই আল্লাহর প্রিয়। ইসলামের নবী মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ (সা.) জীবনভর মানুষের কল্যাণে কাজ করে গেছেন। তাঁর শিক্ষাও হলো মানবতাবোধ ও উদারতার। তিনি শিখিয়েছেন কীভাবে মানুষকে ভালোবাসতে হবে। নিজের জীবনকে কীভাবে পরের জন্য উৎসর্গ করা যায় এটা তিনি বাস্তবেও দেখিয়েছেন এবং এর প্রতি জোর তাগিদও দিয়েছেন।
ইসলাম মানুষকে ত্যাগ ও বিসর্জনের শিক্ষা দেয়। যারা নিজেকে বিলিয়ে দিতে পারে তারাই ইসলামের দৃষ্টিতে সেরা মানুষ। পরের জন্য কিছু করার বাসনা জাগিয়ে তুলে ইসলাম। শুধু মুসলমানই নয়, ভিন্ন ধর্ম ও মতাবলম্বীদের প্রতিও সদাচরণ, উদারতা প্রদর্শন ইসলামের শিক্ষা। আদর্শের শক্তিটুকুই ইসলামের মূল শক্তি। এই শক্তির গুণেই বাহ্যিক উপকরণ না থাকা সত্ত্বেও মুসলমানরা এক সময় বিশ্বকে শাসন করেছে। মুসলমনাদের কাছ থেকে আজ সেই শক্তিটুকু হারিয়ে যেতে বসেছে। আদর্শহীনতার চোরাবালিতে আজ হাবুডুবু খাচ্ছে মুসলমানরা। আমরা আজ ক্রমেই অসহিঞ্চু হয়ে উঠছি। আমরা আজ কাউকে ছাড় দিতে মোটেও প্রস্তুত নই।
আমরা সবাই বিজয়ী হওয়ার অসম প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। অন্যেরটা গোল্লায় যাক, শুধু আমারটা চাই- এই মানসিকতা কাজ করছে সবার ভেতরে। অন্যের জন্য ভাবনা, কারও জন্য কিছু করার মানসিকতা আমাদের মধ্যে আর সক্রিয় নেই। এজন্য মুসলমানরা আজ দুর্দিনে। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ এই জাতির হারানো গৌরব ফেরাতে হলে অবশ্যই ইসলামের আদর্শের কাছে ফিরে আসতে হবে। ক্ষমা, উদারতা, সহিঞ্চুতা এই গুণগুলো মুসলমানদের হারানো সম্পদ। এই সম্পদের সন্ধানে এখনই সবাইকে আন্তরিক হতে হবে।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক