
সাবেক শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের বান্ধবীর স্বামী বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (ববি) বিতর্কিত রেজিস্ট্রার মো. মনিরুল ইসলামকে রক্ষার চেষ্টা করছেন বিশ্ববিদ্যালয়টির বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. শুচিতা শরমিন।
প্রশ্ন উঠেছে, নৈতিক স্খলন, নিয়োগ-বাণিজ্যসহ নানা অভিযোগে অভিযুক্ত মো. মনিরুল ইসলামের বয়স শেষ হয়ে গেলেও কেন তাকে রেজিস্ট্রার পদে রাখার চেষ্টা করছেন বর্তমান উপাচার্য।
জানা যায়, নৈতিক স্খলন, নিয়োগ বাণিজ্যসহ নানা অভিযোগে বিতর্কিত রেজিস্ট্রার মো. মনিরুল ইসলাম ২০১৯ খ্রিষ্টাব্দের ১০ এপ্রিল চাকরিচ্যুত হন। চার বছর বরখাস্ত থাকার পর ২০২৩ সালের অক্টোবরে তিনি ফের যোগদান করেন আদালতের কথিত এক আদেশ নিয়ে।
এর আগে, ২০১৮ খ্রিষ্টাব্দের ১৭ নভেম্বর সিন্ডিকেটের ৫৯তম সভায় বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার মনিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে নৈতিক স্খলনজনিত অভিযোগের তদন্ত প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়। সেখানে মনিরুলের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়। এর প্রেক্ষিতে সিন্ডিকেট সভা থেকে মনিরুল ইসলামকে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করার জন্য আহ্বান জানানো হয়। একই সঙ্গে ওই সভা মনিরুল ইসলামের পরিবর্তে রেজিস্ট্রারের দায়িত্ব দেওয়া হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান ও প্রকৌশল অনুষদের ডিন ড. মো. হাসিনুর রহমানকে। ১৯ ডিসেম্বর এ মর্মে হাসিনুর রহমানকে একটি চিঠিও দেয় বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্তৃপক্ষ।
পরে ২০১৯ খ্রিষ্টাব্দের ১৬ জানুয়ারি দায়িত্বপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার ড. হাসিনুর রহমান স্বাক্ষরিত একটি চিঠি দেওয়া হয় অভিযুক্ত রেজিস্ট্রার মো. মনিরুল ইসলামকে। চিঠিতে মনিরুল ইসলামকে নৈতিক স্খলনের দায়ে পদত্যাগ করতে বলা হয়। তা না হলে বিধি অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়।
এ চিঠির বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে উচ্চ আদালতে যান রেজিস্ট্রার মনিরুল ইসলাম। ওই বছরের ২৩ জানুয়ারি উচ্চ আদালত থেকে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট কমিটির আদেশ স্থগিতের একটি আদেশ নিয়ে মনিরুল ইসলাম বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিতে গেলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ওইদিন দুপুরে কাজে যোগ দিতে মনিরুল ইসলাম বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের কার্যালয়ে যান। কিন্তু উপাচার্য এসএম ইমামুল হক তার যোগদানপত্র গ্রহণ করেননি।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য এসএম ইমামুল হক দৈনিকশিক্ষা ডটকমকে বলেছিলেন, মনিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে নৈতিক স্থখলনজনিত অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। তাকে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করার জন্য ২০১৮ খ্রিষ্টাব্দের নভেম্বরের সিন্ডিকেট সভা থেকে আহ্বান জানানো হয়েছিল। কিন্তু তিনি তা করেননি। উল্টো সিন্ডিকেট সভার সিদ্ধান্ত স্থগিত করার একটি আদেশ পেয়েছেন শুনেছি। সেই কাগজ নিয়ে যোগাদানের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছিলেন। কিন্তু সিন্ডিকেট সভার সিদ্ধান্ত ছাড়া তাকে যোগদান করানো সম্ভব ছিল না। এর প্রেক্ষিতে ২০১৯ খ্রিষ্টাব্দের ২৪ জানুয়ারি ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভা আহ্বান করা হয়। ওই সভা থেকে রেজিস্ট্রার মনিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে দেওয়া ৫৯তম সভার সিদ্ধান্ত বহাল রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে মনিরুলের পক্ষে দেওয়া আদেশ (ভ্যাকেট) বাতিল করার জন্য আইনজীবীর মাধ্যমে উচ্চ আদালতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মো. মনিরুল ইসলাম ঢাকার বেসরকারি (নন-এমপিওভুক্ত) একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে (ক্যামব্রিয়ান কলেজ) ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষর দায়িত্বে ছিলেন। তার স্ত্রী মাসুদা বেগম ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের উপ-পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক থাকাকালীন সময় সাবেক শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের মাধ্যমে মনিরুলকে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেপুটি রেজিস্ট্রার হিসেবে নিয়োগ পাইয়ে দেন। নিয়ম অনুযায়ী কমপক্ষে দুই বছর ডেপুটি রেজিস্ট্রার হিসেবে দায়িত্ব পালন করার পর রেজিস্ট্রার হওয়ার কথা। কিন্তু সাবেক শিক্ষামন্ত্রী এবং তার স্ত্রীর পরিচিতির সূত্রধরে প্রভাব খাটিয়ে নির্দিষ্ট সময়ের আগেই রেজিস্ট্রার হন মনিরুল ইসলাম।
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার হিসেবে যোগদান করার পর থেকে মনিরুল ইসলাম নিয়োগ বাণিজ্যসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাব বিস্তার শুরু করেন। নৈতিক স্খলন সংক্রান্ত অশালীন ভিডিও প্রকাশ পায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে (ফেসবুক)। এ সব কারণে জ্যেষ্ঠ অনেক শিক্ষকসহ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ে। তখন মনিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে আনা নৈতিক স্খলনের অভিযোগের প্রেক্ষিতে সিন্ডিকেট সভা তাকে স্বেচ্ছায় পদত্যাগের নির্দেশ দেয়। এরপরই মনিরুল ইসলাম ছুটি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ত্যাগ করেন।
উল্লেখ্য, ২০১৮ সালের মাঝামাঝি সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি প্রত্যাশী এক তরুণীর সঙ্গে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ ওঠে রেজিস্ট্রার মনিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে। এ সংক্রান্ত একটি ভিডিও ফুটেজ ভাইরাল হয়। ওই ভিডিও প্রমাণসহ রেজিস্ট্রার মনিরুলের বিচারের দাবিতে ভিসির কাছে লিখিত আবেদন করে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি। অভিযোগের প্রেক্ষিতে ভিসি সিন্ডিকেটের ৩ সদস্যের সমন্বয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের প্রেক্ষিতে সিন্ডিকেট সভা রেজিস্ট্রার মনিরুল ইসলামকে নৈতিক স্খলনের দায় নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চাকরি ছেড়ে দিতে বলেন।